কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে রাতের আঁধারে গাছ লুট, হুমকিতে পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য

প্রকাশিত: ৩:১২ অপরাহ্ণ , ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 days আগে
ছবি- কালের বিবর্তন।

আব্দুর রাজ্জাক রাজা, কমলগঞ্জ(মৌলভীবাজার): মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া,কালাছড়া সহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ে গাছ চোরদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ রাত নামলেই লাউয়াছড়াও কালাছড়া বনের চিত্র বদলে যায়। দিনের বেলায় যেখানে বনভূমি নীরব, রাত গভীর হলে সেখানে শোনা যায় কোটার আর করাতের শব্দ।

কাটা হয় সেগুন, আগর, গর্জন, আকাশমণি, চাপালিশসহ মূল্যবান গাছ। এরপর দুর্গম পথ ধরে সেসব কাঠ পৌঁছে যায় জেলার বিভিন্ন করাতকলে। বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান গাছ চুরির ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমি। একই সঙ্গে সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

লাউয়াছড়া বন শুধু কাঠের উৎস নয়,এসব বন বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং জীব বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন উজাড়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থলও। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ চুরির অভিযোগের সঙ্গে বন সংশি¬ষ্ট যোগসূত্রই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি সরজমিনে উদ্যানের ভেতরে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের কাটা গোড়া দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এসবের মধ্যে সেগুন, আগর, আকাশমণি ও চাপালিশ রয়েছে। অথচ লাউয়াছড়া বিট কর্মকর্তার দাবি, সম্প্রতি উদ্যানের বনভূমি থেকে মাত্র একটি সেগুন গাছ কাটা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অধীন কালাছড়া বনবিটের দুর্গম এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে গাছ চোর চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রায় প্রতিদিন গভীর রাতে চক্রটির সদস্যরা বনে গভীরে প্রবেশ করে গাছ কাটে। পরে পাহাড়ি দুর্গম পথ ব্যবহার করে সেগুলো দ্রুত পাচার করা হয়। দুর্গম এলাকায় এসব কর্মকান্ড হওয়ায় অনেক সময় সাধারণ মানুষের নজরেও পড়ে না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবী, রাতের বেলা প্রায়ই বনের ভেতর থেকে গাছ কাটার শব্দ শোনা যায়। কখনো কখনো গাছ বোঝাই যানবাহন বনের রাস্তা দিয়ে বের হতে ও দেখা যায়। বাধা দিতে গেলে চোরাকারবারিদের পক্ষ থেকে হুমকির মুখে পড়তে হয়।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, কালাছড়া বনবিটের বর্তমান কর্মকর্তার যোগদানের পর গাছ পাচারের ঘটনা বেড়েছে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে কালাছড়া বনবিট কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম নাঈম বলেন, গাছ পাচারের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং আমি যোগদানের পর গাছ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সংখ্যক মামলা করেছি।

পরিবেশকর্মী নুরুল মোহাইমিন মিল্টনের অভিযোগ, প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই কয়েকটি করে করাতকল দেখা যায়। প্রতিনিয়ত গাছ চুরি হচ্ছে। এসব গাছ কোথায় যাচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করা জরুরি। অবাধে গাছ নিধন ও অবৈধ করাতকল বন্ধে সংশি¬ষ্ট দপ্তরগুলোর তৎপরতা যথেষ্ট নয়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের দাবি,অবৈধ করাতকল বন্ধে নিয়মিত অভিযান, লাইসেন্সের তথ্য প্রকাশ, করাতকলে আসা কাঠের উৎস যাচাই এবং চোরাই কাঠের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের লাউয়াছড়া রেঞ্জের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, বিগত ৩৫ বছর আগে লাউয়াছড়া বনের ভিতর ছিল অনেক বেশি ঘন ও সমৃদ্ধ। এখন সেই চিত্র নেই। বনের বড় গাছ কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীরা আবাসস্থল ও খাদ্য হারাচ্ছে।

বড় বড় গাছ কেটে ফেলায় অনেক জায়গা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এতে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে সিলেট বিভাগীয় বন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, তাদের দপ্তরে স্টাফ ঘাটতি প্রায় ৪০ শতাংশ। বিট ও রেঞ্জ পর্যায়ে মোটরসাইকেল ও টহল পিকআপ গাড়িরও ঘাটতি রয়েছে।
সুত্রে আরো জানা যায়,বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ৯০ মামলায় আসামি ২৩১ জন। ১৭ জন আটক হয়েছেন।

শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, সেগুন গাছ চুরির বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বনের চুরি হয়ে যাওয়া গাছ উদ্ধার এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ চুরির সঙ্গে বন বিভাগের ভেতরের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মামলা হচ্ছে,কাঠ জব্দ হচ্ছে, গাড়ি আটক হচ্ছে –কিন্তু অধিকাংশ আসামিই ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, মাঠে ধরা পড়ছে কি শুধু কাঠ ও বাহক, আর আড়ালে থেকে যাচ্ছে মূল চক্র।

মন্তব্য লিখুন