৫ মাসে ৬০ টি সাপ উদ্ধার বনের সাপ এখন লোকালয়ে : বাসিন্ধাদের মধ্যে আতঙ্ক

প্রকাশিত: ৩:৪৩ অপরাহ্ণ , ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 hour আগে
ছবি- কালের বিবর্তন।

আব্দুর রাজ্জাক রাজা, কমলগঞ্জঃ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপপ্রণীর অভয়ারণ্য। উদ্যানে বনজঙ্গল আর লতাগুল্ম কমে যাওয়ায় এখন বন্যপ্রানীর খাদ্য ও আবাসন সংকট চরম আকার ধারন করেছে। একসময় যেখানে গভীর বনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল অজগর সহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বিচরণ, এখন সেই সাপ গুলো নিয়মিত দেখা যাচ্ছে মানুষের বাড়ির আঙিনা, হাঁস-মুরগির খামার, বাঁশঝাড়, চা-বাগান, এমনকি হাইল হাওড়ের আশপাশেও।

গত মে মাস থেকে সেপ্টেস্বর এই ৫ মাসে উদ্ধার করা হয়েছে ৬০টি সাপ। ঘন ঘন লোকালয়ে সাপের এ হানায় কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল এলাকার বন ঘেঁষা গ্রামগুলোতে বসিন্ধারা মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বনবিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩মে থেকে ,জুন ,জুলাই,আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই ৫ মাসে কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৬০টি বিভিন্ন প্রজাতি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত সাপ গুলো হচ্ছে,অজগর ৩০টি,ঘরখিন্নি ৩টি,কিলব্যাক ১টি,সবুজ ফনিমনশা ৩টা,তক্ষক ৩টি,দাঁড়াশ ৫টি,গোখরা ৭টি,শঙ্খনী ২টি,বেত আঁচড়া ২টি,সাইবোল্ড ¯েœক ১টি,ক্যান্টর ককরি ১টি,জুনিয়া ১টি ও অন্যান্য ১টি।

এসব উদ্ধার করা হয়েছে কমলগঞ্জের ফুলবাড়ী চা-বাগান,বটতলা,শ্রীমঙ্গল শহরের আরামবাগ, ভূরভূড়িছড়া চা-বাগান ,ভাড়াউড়া চা-বাগান ,সিন্দুরখান এলাকা, হাইল হাওর,পূর্বাশা আবাসিক এলাকা,নোয়াগাঁও,বারিধারা আবাসিক এলাকা, মাঝেরগাঁও,সিন্দুরখান কুঞ্জবন, উত্তর ভাড়াউড়া, জাগছড়া চা-বাগান সহ বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন সময় ও বিভিন্ন তারিখে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব সাপের দৈর্ঘ্য ১২ থেকে ১৮ ফুট এবং ওজন ২০ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১২ থেকে ১৮ ফুট দীর্ঘ অজগরের এমন ঘন ঘন উপস্থিতি কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলের বনসংলগ্ন গ্রাম গুলোতে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তবে বন্যপপ্রণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আতঙ্কের পেছনে দায়ী মূলত বন ধ্বংস, খাদ্যসংকট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারনে।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালে ১২৫০ হেক্টর জায়গা নিয়ে লাউয়াছড়া বনকে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ে লাউয়াছড়ায় ৪৬০ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৫ প্রজাতির সরীসৃপ,২৪৬ প্রজাতির পাখি,২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ১৭ প্রজাতির পোকামাকড় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

পরে বন বিভাগ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকর্মীরা সাপগুলো উদ্ধার করে পুনরায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন। স্থানীয়া বলেন, অবাধে বনের গাছ উজাড় হওয়া, ফলদ গাছের অবক্ষয় এবং গাছের কোটর বা ছড়ার আশেপাশের মাটির গর্ত নষ্ট হওয়ায় অজগরের প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে।

লাউয়াছড়া বনের পাশের্^র ফুলবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ও ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য চঞ্চল গোয়ালা বলেন, একসময় বনের হরিণ বা ছোটখাটো বন্যপ্রাণী লোকালয়ের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করাটা স্বাভাবিক দৃশ্য ছিল।

কিন্তু এখন বনে খাদ্যশৃঙ্খল পুরো ভেঙে পড়েছে। হরিণের দেখা মেলানো তো দূরের কথা, উল্টো প্রায়ই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বিশাল সব অজগর। হাতের কাছে খামারের হাঁস-মুরগি বা গৃহপালিত পশু পেয়ে অজগর সহজ শিকার বানিয়ে ফেলছে।

লাউয়াছড়া বনের পার্শ্ববর্তী বটতলা ও উত্তর বালিগাঁও গ্রামের জাবেদ আলী, রায়হান মিয়া বলেন, বনে খাবার সংকটে রাতে ও দিনের বেলায় বনের শিয়াল,শূকর,বানর,হরিণ,অজগরসাপ বনের পাশ্ববর্তী বাঘমারা, সরইবাড়ী, ভেড়াছড়া, লঙ্গরপুর, টিলাগাঁও ও ভাষানীগাঁও গ্রামে চলে আসে। অভুক্ত প্রাণী গুলো তাদের ক্ষেতের ধান ও ফসলের মাঠ নষ্ট করে ও বসত বাড়ীর হাঁস ,মুরগীর ঘরে প্রবেশ করছে। প্রাণীদের হিংস্র আচরণে আশপাশের লোকজন অতিষ্ঠ।

বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব বলেন, ঘন ঘন বিভিন্ন প্রাণী মানুষের হাতে ধরা পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের খাদ্যসংকট বেড়েছে। প্রাণীগুলো খাদ্যের খোঁজে গ্রামাঞ্চলের ঘরবাড়িতে ছুটে আসছে। তিনি আরো জানান,গত ২৪ সালে তিনি ১০টি অজগরসহ প্রায় ৫০টি প্রাণী উদ্ধার করে বনবিভাগকে হস্তান্তর করেছেন।

লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, ইদানীং প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বনের ছড়ায় পানি থাকায় অজগর লোকালয়ে যাচ্ছে। চা বাগানও অজগরের জন্য একটি অন্যতম নিরাপদ স্থান। বনবিভাগের পক্ষ থেকে মানুষকে সচেতন করার অজগর দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে বনবিভাগকে খবর দেওয়া হয়।

মন্তব্য লিখুন