
নাহিদ হাসান নওগাঁঃ নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন চলছে এক অনন্য উৎসব পানিতালা খাওয়া উৎসব। ঈদুল আজহার লম্বা ছুটি, আর তার সঙ্গে তীব্র গরম, এই দুই মিলিয়ে মানুষ যখন শান্তির খোঁজে, তখন স্বস্তির জোগান দিচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এক মৌসুমি উপহার তালের চোখ, যা এই অঞ্চলে পানি তালা নামে পরিচিত।
গত ক’দিন ধরে নিয়ামতপুরে বইছে মৃদু তাপপ্রবাহ। দিনের তাপমাত্রা কোথাও কোথাও ৩৮-৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। আর এরই মধ্যে চলছে ঈদুল আজহার লম্বা ছুটি। গরমের ঈদের আনন্দ উদযাপন করতে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে যাওয়া রীতিমতো বিপদজনক।
আর এমন গরমে গ্রামে এসে শীতল পানির মতো প্রশান্তি দিচ্ছে এই পানিতালা। এটি তালের ভিতরের সাদা রসালো অংশ, যা ডাবের জলের মতো ঠান্ডা ও আরামদায়ক।
এই তাল এখন শুধু শরীর ঠান্ডা রাখার উপায় নয়, বরং এক সামাজিক মিলনের রূপ নিয়েছে। রাস্তার পাশে, বাড়ির উঠোনে, পুকুর ঘাটে—যেদিকেই চোখ যায়, সেখানেই তাল কাটা, পানি তালা ভাগ করে খাওয়ার আনন্দে মেতে আছে ছোট-বড়, যুবক-বৃদ্ধ, পেশাজীবী-ছাত্র সবাই।
ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতে গ্রামে আসা শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম রনি বলেন,আমি ঢাকায় অনার্সে লেখাপড়া করি। শহরের গরমে তালের নামও শোনা যায় না, আর এখানে একদম ফ্রেশ পানি তালা—বন্ধুদের সঙ্গে বসে খাচ্ছি, শৈশবটা যেন ফিরেছে। শুধু ঠান্ডা না, এটা খাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ তা শহরে মেলে না।
স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন,আমরা শিক্ষকরা এমনিতেই ব্যস্ত থাকি, কিন্তু ঈদের ছুটি আর এই পানিতালার সময়টা পুরো অন্যরকম। সহকর্মী, ছাত্র, প্রতিবেশী—সবাই মিলে একটা মিলনমেলায় পরিণত হয় এই তাল খাওয়া। ছোটবেলার মতোই এখনও তাল কেটে সবাইকে দিচ্ছি, আবার নিজেরাও খাচ্ছি। এই আনন্দ শহরে কোথাও নেই।
এই উৎসব শুধু ঢাকা বা শহরফেরত মানুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামে যাঁরা শিক্ষকতা, কৃষিকাজ, ব্যবসা কিংবা দিনমজুর—যেই পেশাতেই থাকুন না কেন, সবাই মেতেছেন এই গরমের স্বস্তির উৎসব ‘পানিতালা’ খাওয়ার আনন্দে।
প্রতিদিন দুপুরে দেখা যায়, কেউ গাছে উঠে তাল নামাচ্ছেন, কেউ ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে তাল গাছ থেকে নিম্ন পরিপক্ব তাল নামিয়ে ধারালো দা দিয়ে কাটছেন । কাটা তাল খুললেই বেরিয়ে আসে সাদা জেলির মতো তিনটি কোমল চোখ—এটাই পানিতালা। হাতে তুলে সবাই মিলে খায় এই ঠান্ডা ও রসালো অংশ। চারপাশে জমে ওঠে হাসি-আড্ডা, ছবি তোলা আর ভাগাভাগির আনন্দ। একটুকরো তালেই যেন ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি।
স্থানীয় রাকেশ কুমার স্বপন বলেন,এই গরমে শুধু ঠান্ডা খাবার নয়, পানিতালা যেন আমাদের সম্পর্কের ঠান্ডা ছোঁয়া। ছোট-বড় সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার যে আনন্দ, সেটা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। আমি এই মুহূর্তটা ফেসবুকে ক্যাপশনে লিখেছিলাম এখন পানিতাল খাওয়ার সময়।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে তালের চোখ বা পানি তালা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে রয়েছে প্রাকৃতিক পানি, মিনারেল, এবং শর্করা যা গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে সহায়ক। এটি ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমায় এবং শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করে। গরমে হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা কমাতে এই প্রাকৃতিক খাবার খুবই কার্যকর। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটি একদম নিরাপদ ও উপকারী।
পানিতালা এখন আর শুধু একটা মৌসুমি ফল নয়, এটি হয়ে উঠেছে গ্রামের মানুষদের আনন্দ, সংযোগ, শিকড়ের স্মৃতি আর পারস্পরিক ভালোবাসার প্রতীক। ঈদের ছুটি আর গরমের ক্লান্তির ভেতর প্রকৃতির দেওয়া এই উপহার যেন পুরোনো দিনের মতো মানুষকে একসঙ্গে বসতে শিখিয়েছে, হাসতে শিখিয়েছে, আর ভুলে যেতে শিখিয়েছে শহরের কৃত্রিম জীবন।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে ৫ নারী...
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর...
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের নির্দেশ
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের...
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২৫...
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও...