৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে

লোকগানের অমর সাধক কেন্দুয়ার আবদুল মজিদ তালুকদারের প্রতি শ্রদ্ধা

প্রকাশিত: ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ , ২৯ জুন ২০২৫, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 11 months আগে
ছবি- কালের বিবর্তন

মজিবুর রহমান, নেত্রকোনা : একজন মানুষ যখন নিজ জীবনের সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে একটি জাতির আত্মা হয়ে ওঠেন—তখন তিনি কেবল ব্যক্তি নন, হয়ে ওঠেন ইতিহাসেরম কণ্ঠস্বর। লোকগানের সেই চিরস্মরণীয় কণ্ঠস্বর, বাংলার সুরলোকের এক অনন্য বিপ্লবী সাধক—তিনি আবদুল মজিদ তালুকদার। আজ রবিবার ( ২৯ জুন) তাঁর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জানাই সেই কিংবদন্তিকে, যিনি সুরে সুরে লিখে গেছেন আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস।

ভাটির মাটি থেকে উঠে আসা এক বিস্ময় :

১৮৯৮ সালের ৫ জানুয়ারি, নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ইটাউতা গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শুরুটা হয়েছিল এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে। কৈশোরে মসজিদের মিনারে আজানের সুরেই যেন লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের এক মরমি গায়কের আত্মপ্রকাশ। পরিবার ও সমাজের বাধা উপেক্ষা করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সুরের পথ—গানের পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সুরকে আত্মার সাধনায় রূপ দিয়েছেন। তিনি কেবল সংগীতশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন জনগণের হৃদয়স্পর্শী আত্মানায়ক।

সাধনা, বিপ্লব ও সুরের সংগ্রাম

গোবরধন, জালাল উদ্দিন খাঁ, রশিদ উদ্দিনের মতো বরেণ্য গীতিকার-সুরকারদের শিষ্য হয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজের সংগীতভিত্তি। তবে তাঁর সাধনা কেবল রাগ-তালেই সীমাবদ্ধ ছিল না—তিনি ছিলেন মরমি দর্শনের এক জীবন্ত উদাহরণ। হযরত সৈয়দ আব্দুল্লাহ, শাহ সুফী হযরত মাওলানা আব্দুল কুদ্দুছ হাওলাপুরী ও হামজায়ে নূরুল হুদার কাছ থেকে আধ্যাত্মিক দীক্ষা নিয়ে তিনি গানকে পরিণত করেছিলেন এক অন্তর্জাগতিক অভিজ্ঞতায়। প্রেম, প্রতিবাদ, দেহতত্ত্ব ও আত্মানুসন্ধানের দুর্লভ সংমিশ্রণ পাওয়া যায় তাঁর গানে।

ভাষা ও মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর :

১৯৪২ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর গান ও গীতিকবিতার এক বিস্ময়কর যাত্রা। বাংলা ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, এগারো দফা, কাগমারী সম্মেলন—সব আন্দোলনের মিছিলে তিনি ছিলেন কণ্ঠস্বর। তাঁর গান ছিল জনতার ভাষায়, সংগ্রামের প্রেরণায়।
“বাংলা চাই বাংলা চাই, রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই…”
—এই গান একসময় জ্বালিয়ে তুলেছিল পুরো জাতিকে। মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গান ছিল অনুপ্রেরণার হাতিয়ার, ছিল প্রতিবাদের আগুন। তিনি ছিলেন সেই শিল্পী, যাঁর কণ্ঠে গান ছিল শাণিত অস্ত্রের মতো।

সংগ্রাহক, একাডেমির সদস্য, সম্মেলনের সক্রিয় কর্মী :

শুধু গান গেয়েই নয়, বাংলার লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার অমূল্য সম্পদ সংগ্রহ করেও তিনি রেখে গেছেন এক অদ্বিতীয় ঐতিহ্য। তিনি বাংলা একাডেমির সম্মানিত সদস্য হিসেবে সংগীত-সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। সেই সঙ্গে কাগমারী সম্মেলনের প্রথম ও দ্বিতীয় অধিবেশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সচেতনতার পরিচয় বহন করে। গান ছিল তাঁর প্রতিবাদ, আর মঞ্চ ছিল তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র।

গ্রামোফোনের গান, চিরকালীন সুর:

৬৪৬টি গানের সংকলন ‘মজিদগীতি সমগ্র’ বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এক মহামূল্যবান দালিলিক নিদর্শন। তাঁর লেখা ও সুরারোপিত গান রেকর্ড হয়েছে গ্রামোফোনে, সম্প্রচারিত হয়েছে রেডিওতে, ছড়িয়ে পড়েছে মাঠে-ঘাটে-অলিতে-গলিতে।
“মাঝি তোর বৈঠা নে রে”, “সুজন মাঝিরে”, “রূপ দেখিয়া ডুব দিলাম”—এসব গান আজও জীবন্ত, আজও মানুষের হৃদয়ে বয়ে আনে আবেগ ও প্রেম।

এক জীবন, এক প্রজন্মের চেতনা:

১৯৮৮ সালের ২৯ জুন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে এই অনন্য সাধকের শারীরিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু তাঁর গান, দর্শন ও বিপ্লবী কণ্ঠ আজও বেঁচে আছে। তিনি হয়ে উঠেছেন এক প্রজন্মের প্রেরণা, চেতনার দীপ্ত প্রতীক।

তাঁর পরিবার গড়ে তুলেছিল আবদুল মজিদ তালুকদার সংগীত বিদ্যালয় ও স্মৃতি পাঠাগার, যা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ঐতিহ্য আজ বিলীন হওয়ার আশঙ্কায়। অথচ এটাই সেই প্রতিষ্ঠান, যেখানে একসময় সুরের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মুক্তির স্বপ্ন।

শেষ কথা: মূল্যায়নের দাবি:

এমন একজন শিল্পী, যিনি বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের গান লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধে কণ্ঠে অস্ত্র তুলেছেন, সংগীত দিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সংস্কৃতি ও চেতনার যাত্রায়—তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন আজও হয়নি।
মরণোত্তর একুশে পদক তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি। তাঁর স্মৃতি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগে সংগীত বিদ্যালয় ও পাঠাগার পুনঃস্থাপন এবং সংরক্ষণ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে এই সুরসাধক, সংগ্রামী, আধ্যাত্মিক সাধকের কথা। কারণ আবদুল মজিদ তালুকদার শুধু গান লেখেননি—তিনি সুরে-সুরে লিখেছেন বাংলার ইতিহাস।

আজকের এই দিনে, গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি তাঁকে। আমাদের হৃদয়ে, আমাদের গানে—সুরের সাধক আবদুল মজিদ তালুকদার চির অমর থাকুন।