• ছবিঘর মতামত
  • রাস উৎসব–মণিপুরীপাড়াগুলোতে চলছে নানা প্রস্তুতি

রাস উৎসব–মণিপুরীপাড়াগুলোতে চলছে নানা প্রস্তুতি

প্রকাশিত: ৭:০১ অপরাহ্ণ , ২১ নভেম্বর ২০২৩, মঙ্গলবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 years আগে

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মণিপুরী পাড়াগুলোতে বিকেল থেকেই মৃদঙ্গের তালে মণিপুরী গান ভেসে বেড়ায়। গান আর মৃদঙ্গের তাল অনুসরণ করে একটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে মণিপুরিদের নাচের প্রস্তুতি। মণিপুরী–অধ্যুষিত গ্রাম ও পাড়াগুলোতে বইছে উৎসবের হাওয়া। চলছে গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য এবং রাসনৃত্যের মহড়া।

অন্যান্য বছরের মতো এবারও মণিপুরীদের পৃথক দুটি গ্রামে আয়োজন করা হয়েছে রাস উৎসবের। উপজেলার মাধবপুরের জোড়া মণ্ডপে বিষ্ণুপ্রিয়া (মণিপুরী) সম্প্রদায়ের ১৮১ তম এবং আদমপুর মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে মীতৈ (মণিপুরী) সম্প্রদায়ের ৩৮ তম মহারাস উৎসব হবে। রাসপূর্ণিমার আলোয় ভেসে যাওয়ার জন্য মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষার পালা।

মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মণিপুরের রাজা ভাগ্যচন্দ্র মণিপুরে প্রথম এই রাসমেলা প্রবর্তন করেছিলেন। মণিপুরের বাইরে ১৮৪২ সালে কমলগঞ্জের মাধবপুরে প্রথম মহারাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। রাস উৎসবে সকালবেলা ‘গোষ্ঠলীলা’ বা ‘রাখাল নৃত্য’ হয়। গোধূলি পর্যন্ত চলে এই রাখাল নৃত্য।

এরপর সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা শেষে রাত সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হয় রাস উৎসবের মূল পর্ব শ্রী শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলা অনুসরণ। মণিপুরীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের পোশাকে নেচে গেয়ে কৃষ্ণবন্দনা ভোর পর্যন্ত চলে রাসলীলা। রাসনৃত্যে শ্রীকৃষ্ণ, রাধা ও প্রায় ৪০-৫০ জনের মতো গোপী থাকেন।

মঙ্গলবার বিকালে মাধবপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ মাঝের গাঁও ও উত্তর মাঝের গাঁও গিয়ে দেখা যায়, পাড়াগুলোতে চলছে রাস উৎসবের মহড়া। প্রায় ১ মাস ধরে এখানে রাস উৎসবের মহড়া চলছে। মহড়ায় আসা মণিপুরী ছেলেমেয়েদের রাসনৃত্যের বিভিন্ন কৌশল ও নিয়মকানুন শিখিয়ে দিচ্ছিলেন রাসনৃত্যের শিক্ষক অজিত কুমার সিংহ। সঙ্গে রনি সিংহ মৃদঙ্গ বাজিয়ে ও রীনা সিংহা গান গেয়ে সেই মহড়ার তাল দিচ্ছিলেন। রাস উৎসবে এই গান ও তালের সঙ্গেই সারারাত ধরে নাচতে হবে শিল্পীদের। প্রায় ২৫ জন ছেলেমেয়ে শিক্ষকদের কথা অনুযায়ী মহড়া দিচ্ছিলেন।

মহড়ায় আসা শ্যামলী সিনহা ও অরুনা সিনহা বলেন,‘আমরা ছোটবেলা থেকেই নাচ শিখি। কিন্তু সবাই রাস উৎসবে অংশ নিতে পারে না। এ জন্য আমাদের অনেক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এখানে প্রায় ২০ দিন ধরে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতিদিন মহরায় অংশ নিচ্ছি। রাস উৎসব নিয়ে আমাদের ভালো প্রস্তুতি আছে। আমরা চাই আমাদের এই উৎসব দেখার জন্য সবাই আসুক।’

শিক্ষক অজিত কুমার সিংহ বলেন, ‘মূলত রাস উৎসবের প্রায় এক মাস আগ থেকেই মহড়া শুরু করি। রাস উৎসবে অংশ নেওয়া মণিপুরি ছেলেমেয়েদের অনেকেই নতুন। আবার অনেকে পুরোনো। আমরা এক মাস প্রস্তুতি নিয়ে তাদের প্রস্তুত করি। প্রতিদিন নিয়ম মেনে সবাই আসেন। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ মহড়া চলছে।’

রাসনৃত্যের আরেক শিক্ষক ধীরেন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, ‘২৭ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাখাল নৃত্য শুরু হবে। সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাত সাড়ে ১১টার দিকে শুরু হবে রাস নৃত্য। এই রাসনৃত্যের জন্যই মহড়া হচ্ছে। দেশ–বিদেশ দর্শনার্থীরা এই রাস উৎসব দেখতে এখানে ভিড় করেন। এটা মণিপুরীদের ঐহিত্যবাহী উৎসব।’

মাধবপুর মণিপুরী মহারাসলীর সাংঘঠনিক সম্পাদক নির্মল এস পলাশ বলেন, ‘রাস উপলক্ষে আমাদের পাড়ায় পাড়ায় প্রস্তুতি চলছে। প্রতি বছরের ন্যায় ঐতিহ্য ও ধর্মীয় ভাবধারায় ১৮১ তম শ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলা ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই মহোৎসব উপলক্ষ্যে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। রাসলীলা মণিপুরীদের আয়োজন হলেও সকলের আগমনে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির পাশাপাশি অপরাপর সকল জাতিগোষ্ঠীর মাঝে সম্প্রীতির বাঁধনে বেধে চলেছে এই উৎসব রাসলীলা, গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রেমপ্রীতির ঐতিহ্য দর্শন। রাসলীলা বা রাসনৃত্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ঐতিহ্যময় লীলার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মণিপুরী সম্প্রদায়ের এই রাসলীলা গভীর ধর্মীয় ভাব আবেগিত ও অন্যদিকে এক নির্মল সংস্কৃতি। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো লাখো ভক্ত জন, সংস্কৃতি অনুরাগী,গবেষক ছুটে আসেন। কাগজের কারুকার্য খচিত তৈরি শিল্পসমৃদ্ধ রাস কুঞ্জ, বৈচিত্র্যময় রাজকীয় পোশাক আবরণে ধ্রুপদী নৃত্য দর্শন ও শ্রুতিমধুর গীত শ্রবণের মানসে। রাসলীলা আজ একটি সর্বজনীন উৎসব হিসেবে সর্বজনের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে। এই উৎসব ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা বৃদ্ধি পেয়ে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করে তুলেছে বলে আমরা বিশ্বাস রাখি।’