প্রাচীন ঐতিহ্য ও লোক বিশ্বাসের সাক্ষী ১৬৪ তম পাগল নাথের মেলা

প্রকাশিত: ৪:৩২ অপরাহ্ণ , ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 hours আগে
ছবি- কালের বিবর্তন।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গোলয়া গ্রামে ১৬৪ তম পাগল নাথের মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই মেলাকে ঘিরে গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসব মুখর পরিবেশ। ধর্মীয় বিশ্বাস, ভক্তি, মানত ও লোকজ ঐতিহ্যের বন্ধনে পাগল নাথের মেলা আজও স্হানীয় মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

আধুনিকতার প্রভাবে গ্রামীণ জীবনে অনেক পরিবর্তন এলেও গোলয়া গ্রামের পাগল নাথের মেলা তার নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রতি বছর পাগল নাথের মেলা তার নিজস্ব ঐতিহ্য , উৎসাহ ও আবেগ ধরে রেখেছে। দুর – দুরান্ত থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্হিতি মেলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।
ড. চিত্ত রঞ্জন রায় জানান, পাগল নাথের মেলা শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি দীর্ঘ৷ দিনের ঐতিহ্য, ভক্তি, বিশ্বাস ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি আমাদের শিকড়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

স্হানীয়দের বিশ্বাস, প্রায় ১৮৬১ সালে গ্রাম বাংলার মানুষের জীবন ছিল সীমাবদ্ধতায় ঘেরা। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্হা ও যোগাযোগ ব্যবস্হা উন্নত ছিল না। দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ ছিল অপ্রতুল। অসুখ – বিসুখ, পারিবারিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নানা বিপদে পড়লে মানুষ অনেক সময় ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্বিক সাধনার মধ্যে মানষিক শান্তি খুঁজতেন। সেই সময় মানুষের বিশ্বাস ও ভক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন পাগল নাথ।

সে সময় নানা বিপদ – আপদ, রোগধ্যাধি ও দুর্দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় মানুষ পাগল নাথের কাছে প্রার্থনা করতেন। ভক্তদের বিশ্বাস ও লোকমুখে প্রচলিত নানা কাহিনির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এ মেলা মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়ে। সময়ের পরিবর্তন হলেও সেই ঐতিহ্য ও বিশ্বাস আজও গোলয়া গ্রামের মানুষ ধরে রেখেছেন।

শত বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য, ভক্তি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্বিকতায় প্রতি বছর কার্তিক মাসের ৭ তারিখে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছর কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকেই গ্রামজুুড়ে শুরু হয় বিশেষ ধর্মীয় অনুশীলন। কার্তিক মাসের প্রথম দিন থেকেই গ্রামের সব মানুষ নিরামিষ খাবার গ্রহন করেন। পাশাপাশি প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হরিনাম সংকীর্তন, ভক্তিমূলক গান ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রার্থনা করে থাকেন।

নিপেন চন্দ্র সিদ্ধা জানান, পাগল নাথের মেলা আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। ছোট বেলা থেকেই পাগল নাথের মেলার সাথে আমাদের পরিচয়। কীর্তন,পুজা – অর্চনা ও ভক্তদের সমাগম আমাদের মনে আনন্দ ও প্রশান্তি এনে দেয়।

দীর্ঘ ১৬৪ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এ মেলা স্হানীয় লোকজ সংস্কৃতির ও ধর্মীয় চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত। পাগল নাথের মেলা শুধু বার্ষিক আয়োজন নয়। মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। পাগল নাথের মেলা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি ভক্তি, সংযম, সম্প্রীতি ও দীর্ঘদিনেরন ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলন মেলা।

ভক্তদের প্রত্যাশা, পাগল নাথের মেলা যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে ভক্তি, ভালোবাসা, ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেবে। গোলয়া গ্রামের এ ঐতিহ্য শুধু একটি মেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আগামী প্রজন্মের কাছেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বেঁচে থাকবে।

মন্তব্য লিখুন