আশুগঞ্জ লালপুর শুটকি পল্লী ......

মাছের সংকটে বাড়বে শুটকির দাম

প্রকাশিত: ৪:২৬ অপরাহ্ণ , ২১ জানুয়ারি ২০২৪, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 month আগে
শুটকি তৈরি করতে মাছ কুটা নিয়ে ব্যস্ত ব্রাহ্মণবায়ড়িয়ার আশুগঞ্জ লালপুরের শুটকি পল্লীর নারীরা। ছবি- কালের বিবর্তন

মেঘনা নদী বেষ্টিত এলাকা আশুগঞ্জ উপজেলার লালপুর গ্রাম। এই গ্রামটিকে অনেকে আবার শুটকির গ্রাম বলেন। নদী ভিত্তিক গ্রাম হওয়ায় সবসময় এখানে ধরা পরে দেশীয় প্রজাতির মাছ। আর এই মাছ দিয়েই গ্রামটিতে উৎপাদন হয় শুঁটকি মাছ। নদীর তীরবর্তী স্থানে আট-দশ ফুট উঁচু বাঁশের মাচা বানিয়ে চলে এই শুঁটকি মাছের ব্যবসা। প্রতি বছর এখানে আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার শুটকি মাছ বিক্রি হয়। তবে এই মৌসুমে নদীতে মাছের পরিমাণ কমে হওয়ায় ১০০ কোটি টাকার বেশি শুঁটকি বিক্রির আশা করছেন না ব্যবসায়ীরা। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আর সহজ শর্তে ঋণ পেলে শুটকি ব্যবসা আরো সম্প্রসারণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যায়, আশুগঞ্জের লালপুর গ্রামের এই মেঘনার পাড়ের শুঁটকি ব্যবসার শত বছরে ঐতিহ্য। এই শুঁটকি পল্লীতে বর্তমানে ২৬টি মাচা রয়েছে, যেটাকে স্থানীয় লোকজন বলেন ডাঙ্গি। তাঁদের দাবি, গোটা গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০-৮০ টি ডাঙ্গি রয়েছে। এসব ডাঙ্গিতে সময়ভেদে ৩০০ থেকে ৪০০ শ্রমিক কাজ করেন। ২০ আড়তদারসহ প্রায় ১৫০ জন এখানে শুঁটকির ব্যবসা করেন। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদনের কাজ চলে। লবণযুক্ত ও লবণ ছাড়া মানভেদে কয়েক ধরনের শুটকি উৎপাদন হয় এই পল্লীতে।

এগুলো হলো: পুঁটি, শোল, গজার, বোয়াল, ঘইন্না, টেংরা, চাপিলা, লাসু, পাঙ্গাস, রুই, গজার, শোল, পাবদা, কাইক্কা, পুঠা মাছ। গুণে মানে ভালো ও সুস্বাদু হওয়ায় লালপুরের শুঁটকি ঢাকা, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রাঙামাটি, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে রপ্তানি হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদী থেকে মাছ ধরে এই জেলেরা এনে যার যার ডাঙ্গির নিচে রাখে। তারপর সেখানরকার মহিলারা বসে পরে মাছ কুটা-কুটিতে। শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলা নয়, শিশু-কিশোররাও এসে তাদের অভিভাবককে সহযোগিতা করে। তারপর এগুলো কেটে সেই বাঁশের তৈরি মাচার উপর দেওয়া হয় শুকাতে। কয়েকদিন ধরে সেই মাছগুলো শুকিয়ে তৈরি হয় শুটকি। এরপর এগুলো সংরক্ষণ করে শুরু হয় বাজারতজাত।

সেখানকার ব্যবসায়ী সুকমল দাস জানান, তিন কেজি মাছ থেকে এক কেজি লবণযুক্ত ও পৌনে চার কেজি মাছ থেকে এক কেজি লবণ ছাড়া শুঁটকি হয়। প্রতি কেজি লবণযুক্ত পুঁঁটি শুঁটকির পাইকারি দাম ৬০০ টাকা ও লবণ ছাড়া প্রতি কেজি ৮০০ টাকা। তবে খুচরা বাজারে পুঁটি শুঁটকি প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বিক্রি হয়। তাছাড়া শোল ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা, ট্যাংড়া ৫০০-৮০০ টাকা, বাইম শুটকি ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা, গনিয়া শুঁটকি ৮০০ টাকা, মাঝারি গনিয়া ৬০০ টাকা ও ছোট গনিয়া শুঁটকি ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়।
তবে চাহিদা অনুযায়ী নদীতে মাছ না পাওয়ায় উর্ধ্বমুখী মাছের দাম। তাই মানভেদে শুটকির দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়বে বলে জানিয়েছে সুকমল দাস।

ব্যবসায়ী তপন দাস বলেন, এ মৌসুমে মাছের দাম চড়া। তাই ব্যবসার লাভের জন্য শুটকির দামও বাড়াতে হবে। তবে গুড়ের লাব যেনো পিঁপড়ায় খেলো এমন অবস্থা আমাদের। ব্যাংক থেকে ঋণ না পাওয়ায় বিভিন্ন সমিতি ও এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। ফলে লাভের বড় অংশ তুলে দিতে হচ্ছে সমিতি ও এনজিওর হাতে। এতে আমাদের ভাগ্য আর বদল হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র দাস জানান, বিগত ৫ বছর যাবৎ তিনি শুটকি উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। তার ডাঙ্গিতে চান্দা, পুঁটি, বাইম ও চাপিলা শুকটি চাষ করেন তিনি। তবে মাছ সংকট ও অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন কমে এসেছে। আর যতটুকুই উৎপাদন হবে তা আগের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজি প্রতি ৪০-৫০ টাকা বাড়াতে হবে। অতিরিক্ত টাকা বাড়িয়ে লাভের মুখ দেখি না। কারণ মুনাফার অর্ধেকই চলে যায় সুদের খাতে। তাই সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এই ব্যাবসায়ী।

এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী আব্দুল কাইয়ূম খাদেম জানান, শুঁটকি পল্লীর ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা রয়েছে। তারা জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা ঋণ সুবিধা নিতে পারবে।

এদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ আলমগীর কবির বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদী ও খাল-বিলে পানি কম থাকায় এবার মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া নিরাপদ শুটকি উৎপাদন ও সংরক্ষণে শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভা এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর