কমলগঞ্জের রাধাবতী”র তৈরি কলা গাছের সুতায় “কলাবতী” শাড়ি

প্রকাশিত: ৩:১৫ অপরাহ্ণ , ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 hours আগে
ছবি- কালের বিবর্তন।

আব্দুর রাজ্জাক রাজা,কমলগঞ্জ: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে মণিপুরি অধ্যুষিত প্রত্যন্ত গ্রাম ভানুবিল মাঝেরগাঁও গ্রামের বাসিন্ধা রাধাবতী দেবী। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বান্দরবান গিয়ে কলার তন্তÍ থেকে শাড়ি বুনন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে শাড়ি উপহার দিয়ে রাধাবতী দেবী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।

সে সময় প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়ে তাকে ১লাখ টাকা ও তার সঙ্গে থাকা অন্যান্যদেরও সম্মাননা দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও তহবিলের অভাবে সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনা এখন বিলুপ্তির পথে। পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রশিক্ষণের অভাবে নতুন করে কাজ করতে পারছেন না।

রাধাবতী দেবী জানান, ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। অবিবাহিতা রাধাবতী দেবী থাকেন ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষক রঞ্জীত সিংহের পরিবারে বাবার বাড়ীতে। তাদের পরিবারের ১০ সদস্য। তিনি তাঁতবস্ত্র তৈরি করে সংসার চালাতে ভাইকে সহায়তা করেন। তিনি ১৯৭৫ সাল থেকে বাড়িতে টকটকি (বড় তাঁতে) মণিপুরি বস্ত্র বুনন করেন।

তাঁতবস্ত্র তৈরিতে ১৯৮৬ সালে প্রথম ভারতের মণিপুরের ইম্পলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। এরপর কমলগঞ্জের মাধবপুরে মণিপুরি ললিত কলা একাডেমিতে ২০১০ সালে ২বার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন মণিপুরি তাঁতবস্ত্র বুননে এলাকায় অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন। মাফলার,ওড়না,শাড়ি,গামছা,ত্রিপিছ তৈরি করতেন। কোনো তাঁতবস্ত্র দোকানের চাহিদা আসলেই সে হিসেবে তৈরি করে দিতেন।

রাধাবতী দেবী আরো বলেন, গত ২০২৩ সালে বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরিজি তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বান্দরবানে। বলা হয় কলাগাছের সুতা দিয়ে একটি শাড়ি বুনন করে দিতে। প্রথমে এই সুতা দিয়ে শাড়ি বানানো যাবে না বললেও পরবর্তীতে কলাগাছের সুতা সঙ্গে এনে কমলগঞ্জে নিজ বাড়িতে তাঁত সুতার সঙ্গে মিশিয়ে প্রথমে একটি ওড়না বুনন করলেন।

এরপর নিজ বাড়ির তাঁত সঙ্গে নিয়ে বান্দরবন গিয়ে শুরু করেন শাড়ি বুনন। এক কেজি কলার সুতার সঙ্গে তাঁত সুতার সংমিশ্রণ করে ৩জন সহয়োগীর সহায়তায় টানা ১৫ দিনে কলার সুতার শাড়ি বুনন করে চমকে দিয়েছিলেন। শিল্পীর নামের অংশের মিল রেখে শাড়িটির নাম দেওয়া হয়েছিলো ‘কলাবতী’। দেশে শাড়ির বাজারে নতুন যোগ হয় কলাগাছের সুতার শাড়ি।

সেই সময় মূলত বান্দরবান জেলার আর্থ সামাজিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে কলা গাছ থেকে সুতা তৈরি বিভিন্ন হস্তজাত শিল্পের পাশাপাশি শাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সুতা তৈরি করার পর শাড়ি তৈরির জন্য কমলগঞ্জ থেকে তাঁত শিল্পী রাধাবতী দেবীকে নিয়ে গিয়ে “কলাবতী”শাড়ী তৈরী করিয়ে ছিলেন।

বান্দরবান জেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণে প্রথম শাড়ি বুনন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মাত্র ৯টি ‘কলাবতী’ শাড়ি তৈরি করেছেন। একটি শাড়ি তৈরিতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় এবং ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়।

রাধাবতী দেবী জানান, সরকার বা ব্যক্তি উদ্যোগে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কোন প্রশিক্ষণ বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। ফলে শিল্পটি অনেকটাই আলোর মূখ দেখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা আর হয়ে উঠেনি। এই শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ও বাণিজ্যিক ভাবে ছড়িয়ে দিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার সহায়তা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, যে কলাগাছ থেকে সুতা বের হয় এসব কলা গাছ আমাদের সিলেট অঞ্চলে নেই। বান্দরবানের পাহাড় থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে সুতা বের হয়। আমি এখন বিছানার চাদর তৈরি করি। এসব চাদর দেশে ও দেশের বাহিরে বিক্রি করা হয়।

তিনি আরো বলেন,ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ঐ বছর সেপ্টেম্বরে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে ২০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে ৩০ জন নারীকে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বুনন শেখানো হয়।

এখানে ৪টি শাড়ি তৈরি করি। একই বছর বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ৬০ দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওখানে ৪টি শাড়ি তৈরি করে ছিলাম। এরপর থেকে এই বিষয়ে আর কেউ কোন খোঁজ করেনি।

বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয় উপব্যবস্থাপক মোঃ শামীম আলম বলেন, কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরি পুরোপুরি বন্ধ আছে। আমরা ২ মাসের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। তবে এই প্রকল্পটি সাফল্য পায়নি, এজন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ থেকে সবকিছু অনেক বেশি ব্যয় হয়।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড থেকে জানা যায়, কলা গাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারে আনার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। এজন্য দুই মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে তা বাজারে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। একটি শাড়ি তৈরি করতে অনেক টাকা খরচ হয়। শাড়ি তৈরির পর আরামদায়ক ও মসৃণ হয়না।

কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারে আনতে সুতার মিশ্রণ, মসৃণতা ও খরচ কমানো নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন ।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহা এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কলা গাছের সুতায় তৈরি শাড়ি এখনও বাজারে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। শাড়িটি বাজারে আনতে গবেষণার প্রয়োজন।

একটি শাড়িতে কতোটুকু কলা গাছের সুতা ব্যবহার হবে এছাড়া অন্য সুতা কতোটুকু ব্যবহার হবে তা সুস্পষ্ট হয়নি। এছাড়াও মসৃণ ও আরামদায়ক হতে হবে।

এসব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, শুধু বান্দরবান নয় এসব শাড়ি অনেকেই বানানোর চেষ্টা করছেন। তাঁত বোর্ডের কাছে যদি এ বিষয়ে কেউ সহযোগিতা চায় তাহলে আমরা সহযোগিতা করবো।