ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মীর মশাররফ হোসেন হল ভবন ধ্বংস করে নতুন করে নির্মাণের সুপারিশ করেছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সেই সুপারিশের পর পেরিয়ে গেছে তিন বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু এখনো ভবনটি খালি করা হয়নি, শুরু হয়নি ধ্বংস বা পুনর্নির্মাণের কাজ। এমনকি স্বাধীন কোনো বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষাও হয়নি।
ফলে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত এই ভবনেই থাকতে হচ্ছে। রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় পরিচালিত একটি প্রকৌশলগত জরিপের পর ২০২৩ সালের ১২ মার্চ মীর মশাররফ হোসেন হল ধ্বংসের সুপারিশ করা হয়। রাজধানী ও আশপাশের এলাকার ৩ হাজার ২৫২টি স্থাপনার ওপর চালানো ওই জরিপে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সাত দিনের মধ্যে খালি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হলটি খালি করা কিংবা ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
১৯৭৩ সালে ২ দশমিক ৮১ একর জায়গার ওপর নির্মিত মীর মশাররফ হোসেন হলের নকশা করেছিলেন দেশের খ্যাতিমান স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। চারতলা ভবনটির প্রজাপতির মতো বিশেষ আকৃতির নকশা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচায়ক।
হলটিতে মোট ৪৯০টি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে ২৬৪টি একক আসনের এবং ২২৬টি দ্বৈত আসনের কক্ষ। বর্তমানে এখানে ছয় শতাধিক শিক্ষার্থী বসবাস করছেন।
রাজউকের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভবনটির কাঠামোগত কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা ভূমিকম্পের সময় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
২০২৩ সালে রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী জানিয়েছিলেন, তুলনামূলক কম মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও ভবনটির কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা পাওয়া গেছে।
তাঁর মতে, ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ভবনটি ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভবনটির বয়স এবং নির্মাণে ব্যবহৃত সংযোজক উপকরণের বিষয়টিও এ ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজউকের সুপারিশের সঙ্গে অবশ্য তখন একমত হয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০২৩ সালের জুনে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম দাবি করেছিলেন, হলটির কাঠামো মজবুত এবং এটি ভেঙে ফেলার প্রয়োজন নেই।
তিনি জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি স্থাপত্য দল ভবনটি পরীক্ষা করে এমন কোনো অস্বাভাবিকতা পায়নি, যার কারণে ভবনটি ভেঙে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে।
মাজহারুল ইসলাম ফাউন্ডেশনও ভবনটি পরিদর্শন করে। রাজউকের ধ্বংসের সুপারিশে তারাও বিস্ময় প্রকাশ করে।
এরপর ভবনটির প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমদ আনসারিকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তবে অধ্যাপক আনসারি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পরও পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ বা তাঁকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।
অধ্যাপক মেহেদী আহমদ আনসারি বলেন, ভবনটির বিষয়ে আরও একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে বিস্তারিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু ধ্বংস করাই একমাত্র সমাধান নয়; ভবনটি সংরক্ষণের জন্যও বিকল্প কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাজউকের সুপারিশের পর তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মীর মশাররফ হোসেন হল নিয়ে কার্যকর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ধ্বংস, পুনর্নির্মাণ কিংবা স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত মূল্যায়ন কোনোটিই দৃশ্যমানভাবে এগোয়নি।
এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে মাজহারুল ইসলামের নকশায় নির্মিত ঐতিহাসিক ভবনটি সংরক্ষণ করা হবে, নাকি ভেঙে নতুন ভবন করা হবে তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শিমুল বলেন, ‘আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবনটির ঝুঁকি সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই আমাদের এখানে থাকতে হচ্ছে।’
রাজউকের প্রকল্প পরিচালক আবদুল লতিফ হেলালী বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে হলটি খালি করা উচিত। ভবনটিকে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করতে চাইলে সেটি পুরোপুরি খালি করে জাদুঘর কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মীর মশাররফ হোসেন হলের বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও মুঠোফোনে না পেয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয় কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে একদিকে রাজউকের প্রকৌশলগত মূল্যায়নে ওঠা ভূমিকম্পঝুঁকি, অন্যদিকে মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ভবন এই দুই বাস্তবতার মাঝেই আটকে আছে মীর মশাররফ হোসেন হলের ভবিষ্যৎ।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে থাকা ছয় শতাধিক শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা। ভবনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত যত বিলম্বিত হচ্ছে, ততই বাড়ছে তাদের অনিশ্চয়তাও।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561, ইমেইলঃ news@kalerbiborton.com
© কালের বিবর্তন ২০১৯ - ২০২৪ সর্বসত্ব সংরক্ষিত