আব্দুর রাজ্জাক রাজা,কমলগঞ্জঃ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে অবস্থিত মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীর সাবেক উপপরিচালক ও বর্তমান গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস চন্দ্র সিংহের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও এখনো নেওয়া হয়নি কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়ার চার মাস পার হলেও রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ রয়েছে একাডেমির নির্বাহী পরিষদ।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে দাপ্তরিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাওয়ায় একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের আনন্দ উৎসব এবং ২৭ এপ্রিল ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ‘বিভিন্ন জাতি-বৈচিত্র্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’-এ প্রভাস চন্দ্র সিংহের নেতৃত্বে একাডেমির একটি শিল্পী দল অংশ নেয়। ওই দুই অনুষ্ঠানে শিল্পীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সম্মানী ও যাতায়াত ভাড়ার টাকা থেকে কম টাকা প্রদান করার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, যাতায়াত ভাড়ার ১৪ হাজার টাকা এবং সম্মানী ভাতার ৭ হাজার টাকা পুরোপুরি আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া, দুই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের জন্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৫৫ জন শিল্পীকে মাত্র ১ হাজার টাকা করে প্রদান করে বাকি টাকা তিনি নিজে পকেটস্থ করেন।
এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই অংশগ্রহনকারী শিল্পীদের পক্ষ থেকে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে একই বছরের ১৩ আগস্ট মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি) আসমা সুলতানা নাসরিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।
তদন্ত শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ২০২৬ সালের ২৪ ফের্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর ২০২৬ সালের ৯ মার্চ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘পরিমেয় ঐতিহ্য’ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব শিউলী হরি স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রভাস চন্দ্র সিংহের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীর নির্বাহী পরিষদকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে মন্ত্রণালয়ের আদেশ পৌঁছানোর চার মাস পেরিয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারণে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি নিয়মিত অফিসে এসে প্রশাসনিক কাজে সক্রিয় রয়েছেন, যা একাডেমির কর্মপরিবেশ ব্যাহত করছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাডেমির কর্মচারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। এতে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বিনষ্ট হচ্ছে এবং সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।”
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর প্রভাস চন্দ্র সিংহ তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) পাশ কাটিয়ে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের দায়িত্ব নেন।
পরবর্তীতে অনিয়মের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ২০২৬ সালের ১১ মার্চ মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কমলগঞ্জ ইউএনও-কে নতুন পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত একাডেমির পরিচালকের দায়িত্ব দেন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকাকালে তিনি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সরকারি অনুষ্ঠানের টাকাতেও ব্যাপক ছয়নয় করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস চন্দ্র সিংহের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও একাডেমির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, একাডেমীর নির্বাহী পরিষদের আগামী সভায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পর্যালোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন ও বিষয় উল্লেখ্য করে হোয়াটআপে ম্যাসেজ পাঠানো হলে ও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীর ভাবমূর্তি রক্ষা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত সময়সীমার মধ্যে দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী ও একাডেমির ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561, ইমেইলঃ news@kalerbiborton.com
© কালের বিবর্তন ২০১৯ - ২০২৪ সর্বসত্ব সংরক্ষিত