অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এগিয়ে নিতে ছেলের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় ফুলঝুড়ি

প্রকাশিত: ৩:০৬ অপরাহ্ণ , ১৫ মে ২০২৬, শুক্রবার , পোষ্ট করা হয়েছে 3 weeks আগে
ছবি- কালের বিবর্তন।

নিজের জীবনের অসমাপ্ত স্বপ্নকে নতুন করে ছুঁতে, সমাজে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দিতে এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতেই ২৯ বছর পর আবার বই হাতে তুলে নিয়েছেন নাটোরের লালপুর উপজেলার নওপাড়া গ্রামের ফুলঝুড়ি বেগম। এবার তিনি একা নন—পাশে আছে তাঁর ছেলে মনিরুল ইসলাম। মা-ছেলে একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায়।

নাটোরের লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের এই ঘটনাটি ইতোমধ্যেই এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, এটি শুধু একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ঘটনা নয়; এটি সমাজ বদলের এক অনন্য বার্তা।

ফুলঝুড়ি বেগম ও তাঁর ছেলে মনিরুল ইসলাম দুজনই মোহরকয়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার ট্রেডের শিক্ষার্থী। উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে তাঁরা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার কারণে ফুলঝুড়ি বেগমের বিয়ে হয়ে যায়। এরপর সংসার, সন্তান আর জীবনের সংগ্রামে হারিয়ে যায় তাঁর পড়াশোনার পথ। কিন্তু মনের ভেতরে শিক্ষার আলো জ্বালানোর স্বপ্ন কখনো নিভে যায়নি।

২০০২ সালে লালপুর অঞ্চলে গড়ে ওঠা ভূমি আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন ফুলঝুড়ি।

তিনি অসহায় ও ভূমিহীন মানুষদের সংগঠিত করে খাস জমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রতিরোধ ও নারী সচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

ফুলঝুড়ি বেগম মনে করেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। আর সেই বিশ্বাস থেকেই দীর্ঘ বিরতির পর আবারও শ্রেণিকক্ষে ফেরা।

তিনি বলেন, “সংসারের কারণে সপ্তম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারিনি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট সবসময় ছিল। পরে ছেলের পড়াশোনা দেখে সাহস পাই।

মনে হয়েছে, মানুষকে সচেতন করতে হলে নিজেকেও শিক্ষিত হতে হবে। তাই ছেলের সঙ্গে আবার ভর্তি হই। এখন একসঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারছি—এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”

তিনি আরও বলেন, “আমি চাই, সমাজের নারীরা বুঝুক—বয়স কোনো বাধা নয়। সুযোগ না পেলেও আবার শুরু করা যায়।”
ছেলে মনিরুল ইসলাম মায়ের এই সাহসী সিদ্ধান্তে গর্বিত।

সে বলে, “মা শুধু আমার মা নন, তিনি আমার সহপাঠীও। আমরা একসঙ্গে পড়েছি, একসঙ্গে পরীক্ষা দিচ্ছি। আমার বন্ধুদের কাছেও এটা গর্বের বিষয়। মা আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা দেন।”

সংগ্রামী এই পরিবারের কর্তা নজরুল ইসলাম ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। পাশাপাশি গরু-ছাগল পালন করেও পরিবারকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, “অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। বড় মেয়েকে নার্সিং পড়িয়েছি, এখন সে ঢাকায় চাকরি করছে। এবার স্ত্রী আর ছেলে একসঙ্গে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তাহানুর ইসলাম বলেন,
“ফুলঝুড়ি বেগম প্রমাণ করেছেন—শিক্ষা গ্রহণের জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি। মা-ছেলের এই উদ্যোগ সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।”

লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জুলহাস হোসেন বলেন,
“এটি শুধু লালপুর নয়, সারা দেশের জন্য নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় উদাহরণ। তাঁর এই প্রচেষ্টা অন্যদেরও উৎসাহিত করবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর পড়াশোনায় সহযোগিতা করা হবে।”

গ্রামবাংলার মাটিতে প্রতিদিন অসংখ্য গল্প জন্ম নেয়। কিন্তু ফুলঝুড়ি বেগমের গল্পটি আলাদা। কারণ তিনি শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণে বই হাতে নেননি; নিয়েছেন সমাজকে বদলে দেওয়ার প্রত্যয়ে।

তাঁর এই পথচলা যেন বলে দেয়—অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শিক্ষা সবচেয়ে বড় শক্তি, আর শেখার জন্য কখনোই দেরি হয় না।