ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৃত মানুষকে “দাতা” বানিয়ে জমির দলিল তৈরি

প্রকাশিত: ৯:১৫ অপরাহ্ণ , ১০ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 months আগে
দখল হওয়া নিজের জমির পাশে বসে আছে অসহায় বৃদ্ধা।ছবি- কালের বিবর্তন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিভৃত গ্রাম সীতানগর। চারদিকে সবুজ ধানের ক্ষেত। সেই ক্ষেত ঘিরেই এখন আতঙ্ক, ক্ষোভ আর বিস্ময়ের গল্প। কারণ অভিযোগ উঠেছে, মৃত মানুষকে “দাতা” বানিয়ে তৈরি করা হয়েছে জমির দলিল!

সংখ্যালঘু ঋষি সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের দাবি, তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ফসলি জমি দখল করতে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জাল দলিল তৈরি করেছে। আর সেই দলিলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিজয়নগরের লক্ষীমুড়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন।

ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আলোচিত দিক যে দলিল দেখিয়ে জমির মালিকানা দাবি করা হচ্ছে, তার দাতাদের তালিকায় রয়েছেন এমন দুজন ব্যক্তি, যারা দলিল তৈরির আগেই মারা গেছেন।

প্রতিবেদকের কাছে আসা তথ্য বলছে, অজিত কুমার রায় মারা যান ২০০৮ সালে, আর অনিল কান্তি রায় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। অথচ ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে আনোয়ার হোসেনের তৈরি করা দলিলে তাদের নাম দাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোক্তভোগী ঋষি পরিবারের মনে এখন প্রশ্ন একটাই – যারা আর বেঁচেই নেই, তারা কীভাবে দলিল করে দিলেন? আর এই প্রশ্নের উত্তর ও সঠিক বিচার পেতে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সুমন ঋষি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২৪ আগস্ট।

সুমন ঋষির অভিযোগ, তিনি সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনুসন্ধান করে ১২৯৮৮/২৩ নম্বর দলিলের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। তবে এসিল্যান্ড অফিসে দেখা যায়, ওই জাল দলিলের ভিত্তিতেই আনোয়ার হোসেন নিজের নামে খারিজা খতিয়ান (নং ২৫-৯০২৬) খুলেছেন। এছাড়া দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারের সীল-স্বাক্ষর, দাতাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।

মামলার বাদী জানান, তার বাবা রমেশ ঋষি ২০০৪ সালে বৈধ দলিলের মাধ্যমে ৭৭ শতক জমি ক্রয় করেন এবং দীর্ঘদিন ভোগদখলে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে তারা জমির মালিক হন এবং এখনও সেখানে ফসল উৎপাদন করছেন।

আর সেই আনোয়ার হোসেনের লোকজন তাদের জমিতে যেতে বাধা দিচ্ছে এবং পাকা ধান কাটতে গেলে হামলার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গীতা রাণী ঋষি। নিজের সম্পদ দখল হয়ে যাওয়ার ভয়ে তিনি এখন দিশেহারা। তিল তিল করে জমানো অর্থ দিয়ে ২০০৪ সালে কেনা জমি চোখের সামনে বেহাত হয়ে যাচ্ছে মানতেই পারছেন না তিনি। বিচার চাচ্ছেন দেশ প্রধান তারেক রহমানের কাছে।

শুধু গীতা রাণী নন, সুমতা ঋষি, সুরবালা ঋষিরও আর্তনাদ করছেন নিজের সম্পদ ফিরে পেতে।

এদিকে মামলা ব্যাতিতও সুজন ঋষি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। যাতে জাল দলিলের মাধ্যমে জমি দখলের চেষ্টা বন্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

জমির মালিকদের মধ্যে সুজন ঋষি, সুমন ঋষি, কমল ঋষি, জুয়েল ঋষি জানান, আনোয়ার হোসেনের দলিলটি ভুয়া। ওই দলিলের কথিত ছয়জন দাতার মধ্যে অনিল কান্তি রায় ও অজিত কুমার রায় দাবিকৃত দলিল হওয়ার আগেই মারা গেছেন। অজিত কুমার রায় ২০০৮ সালে ২০ মে ও অনিল কান্তি রায় ২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি মারা যান। জমির দলিলে ছয়জনের স্বাক্ষর যে একই হাতে তা স্পষ্টই বুঝা যায়। এছাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসে গিয়েও এ ধরণের দলিলের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এখন ভুয়া দলিল দেখিয়ে জোর করে জায়গা দখলের পায়তারা চলছে।

অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন দাবি করেছেন, তিনি ২০১২ সালেই জমিটি কিনেছেন এবং তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের দলিল এবং মৃত ব্যক্তিদের দাতা হিসেবে দেখানোর বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।