
মো. তাসলিম উদ্দিন সরাইল(ব্রাহ্মণবাড়িয়া): তিতাসের ঢেউয়ে সরাইলের নৌকা বাইচের উন্মাদনা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আজকে সরাইল উপজেলার তিতাস নদীর বুকে নৌকা বাইচ দেখার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের এক অনন্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।
শাহজাদপুর ইউনিয়নের মলাইশ সংলগ্ন তিতাস নদীর দুই তীরে অসংখ্য মানুষের ঢল নামে। চোখের পলকেই দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ নদীর দুই তীরজুড়ে জড়ো হয়েছে শুধুমাত্র নৌকা বাইচ দেখার জন্য। দূর-দূরান্ত থেকে গ্রামীণ জনতা, শহরের মানুষ, তরুণ-তরুণী, বয়স্ক সবাই ভিড় করেছে।
কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ নৌকায় বসে কেউ কেউ মঞ্চে বসে উপভোগ করেছে এই নৌকা বাইচ। চারপাশে মানুষের উল্লাস, হাততালি, শিস, ঢাক-ঢোলের আওয়াজে তিতাস নদী যেন এক বিশাল জনসমুদ্রের রূপ নিয়েছে। আমার নিজের ভেতরেও ছিল এক অদ্ভুত শিহরণ, যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে আগের দেখা অনেক স্মৃতি।
আজকে যখন প্রতিযোগিতার নৌকাগুলো নদীর বুকে সাজ সাজ রূপে দাঁড়িয়ে যায়, দাঁড়িদের হাতে বৈঠা, গায়ে একরঙা পোশাক, আর গলায় সুর তোলা গান তখন মুহূর্তেই পরিবেশ রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। সেই গান, ‘‘সখি করি গো মানা, কালো জলে ঢেউ দিওনা গো সখি কালো জলে ঢেউ দিও না’’ যেন সময়ের সীমানা ভেঙে অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
দাঁড়িদের ছন্দময় বৈঠা চালনা, দর্শকের উৎসাহ, আর ঢেউ খেলানো পানির শব্দ মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অপূর্ব আবহ। নৌকা যখন গতি পায়, তখন দর্শকের কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনি ওঠে উল্লাসে আকাশ-বাতাস কাঁপতে থাকে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি কোনো আধুনিক খেলার মাঠে নয়, বরং কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক সেই তিতাসের নৌকা বাইচে সময় ভ্রমণ করছি।
সরাইলের নৌকা বাইচ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি সামগ্রিক লোকোৎসব। এর প্রাচীনতা এতটাই সমৃদ্ধ যে তা ইতিহাসের দলিলেও খুঁজে পাওয়া যায়। ত্রিপুরা জেলা গেজেটীয়ার থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালে তিতাস নদীতে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচ ছিল এক ঐতিহাসিক আয়োজন।
সেই প্রতিযোগিতায় আখাউড়া, আশুগঞ্জ, চান্দুরা ও কুটির ইংরেজ পাট ব্যবসায়ীরা বিপুল সোনার মেডেল দিয়ে প্রতিযোগীদের পুরস্কৃত করেছিলেন। সে আয়োজন এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে পুলিশের হস্তক্ষেপ ছাড়া শান্তি রক্ষা সম্ভব হয়নি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মিঃ ওয়ারসের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এখানে নির্দিষ্ট নিয়মের প্রতিযোগিতা ছিল না।
এক নৌকা আরেক নৌকাকে চ্যালেঞ্জ জানাত, দাঁড়িরা তালে তালে বৈঠা চালাত, আর যে নৌকা অন্যটিকে পেছনে ফেলতে পারত, তাকেই বিজয়ী ধরা হতো। ত্রিশের দশকেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর সংলগ্ন তিতাস নদীতে জাঁকজমকপূর্ণ গণ-উৎসবের মধ্য দিয়ে এই নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হতো। বিজয়ী নৌকাকে দেওয়া হতো মেডেল, কাপ, শিল্ড, পিতলের কলস কিংবা এমনকি একটি পাঁঠা পর্যন্ত পুরস্কার হিসেবে।
তখনকার দিনে নৌকা বাইচকে ঘিরে শুধু প্রতিযোগিতা নয়, পুরো এলাকা জুড়ে এক উৎসবের আবহ তৈরি হতো। নদীর বুকে লঞ্চ, ছোট নৌকা, কোষা, কলাগাছের ভেলা এমনকি মাটির গামলাও সাজানো হতো রঙ-বেরঙের কাগজের ফুল দিয়ে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আনন্দে মেতে উঠত। আজও সেই ঐতিহ্য বহমান।
আজকের দিনে এসে সরাইলের নৌকা বাইচ সেই একই উচ্ছ্বাসের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তবে মানুষের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে নদীর তীরে জড়ো হয়ে শুধু প্রতিযোগিতা দেখে না, তারা যেন নিজেদের ঐতিহ্যকে স্পর্শ করে। এটি সরাইলবাসীর জন্য কেবল একটি ক্রীড়া অনুষ্ঠান নয়, বরং তাদের সংস্কৃতির জীবন্ত অংশ, তাদের গৌরবের প্রতীক।
তিতাসের নৌকা বাইচ আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। মানুষের ঢল, নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলা নৌকা, সুরের মূর্ছনা, ইতিহাসের আবহ সব মিলিয়ে মনে হয়েছে আমি যেন এক মহোৎসবের অংশ। সরাইলের নৌকা বাইচ শুধু নদীর জলে নয়, মানুষের হৃদয়ে ঢেউ তোলে, যা যুগ যুগ ধরে আমাদের সংস্কৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে ৫ নারী...
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর...
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের নির্দেশ
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের...
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২৫...
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও...