মো. তাসলিম উদ্দিন সরাইল(ব্রাহ্মণবাড়িয়া): আর্সেনিক: নীরব ঘাতকের অভিশাপ ও কিছু কথা। সরাইল জনস্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে আজ সরাইল উপজেলা পরিষদের হলরুমে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হয় "আর্সেনিক মুক্ত নিরাপদ নলকূপ স্থাপনের লক্ষ্যে স্থানীয় মিস্ত্রীদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি" শিরোনামে।
এখানে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাগণ ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের দুইজন সম্মানিত শিক্ষক। পানি বিষয়ে পড়াশোনা করার কারণে কিছুটা ধারণা রয়েছ আর্সেনিকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে।
প্রধান অতিথি হিসেবে কর্মশালায় কথা বলেছি আর্সেনিক নিয়ে... আর্সেনিক পৃথিবীর ভূত্বকের একটি প্রাকৃতিক উপাদান হলেও মানুষের জীবনে এর উপস্থিতি এক ভয়ঙ্কর অভিশাপে পরিণত হয়েছে। ধূসর রঙের ভঙ্গুর ধাতব-সদৃশ এই মৌলটি একদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও অন্যদিকে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকির উৎস।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নানা সময়ে আর্সেনিককে ঘিরে রহস্য, কৌতূহল ও আতঙ্কের গল্প পাওয়া যায়। একসময় এটি বিষবিজ্ঞানের ভাষায় “রাজাদের বিষ” বা “রাজহত্যার হাতিয়ার” হিসেবে খ্যাত ছিল। আবার কখনো প্রাচীন চিকিৎসাবিদ্যার অংশ হিসেবেও এর ব্যবহার দেখা গেছে।
কিন্তু আধুনিক যুগে বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে আর্সেনিক মিশে যাওয়ায় কোটি কোটি মানুষ আজ এক নীরব মৃত্যুর হুমকির মুখে। এই মৌলকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকটেরও প্রতিফলন।
আর্সেনিক একটি প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান উপাদান, যার প্রতীক As এবং পারমাণবিক সংখ্যা ৩৩। এটি পর্যায় সারণির পঞ্চম প্রধান গোষ্ঠীর (Group 15) সদস্য। আর্সেনিক একটি মেটালয়েড (Metalloid), অর্থাৎ এতে ধাতু ও অধাতু উভয়ের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এটি সাধারণত ধূসর, হলুদ অথবা কালো বর্ণের রূপে পাওয়া যায়, তবে স্থিতিশীল রূপটি হলো ধূসর আর্সেনিক।
এর পারমাণবিক ভর প্রায় ৭৪.৯২ গ্রাম/মোল। আর্সেনিকের গলনাঙ্ক প্রায় ৮১৭° সেলসিয়াস (চাপ প্রয়োগে) এবং স্ফুটনাঙ্ক প্রায় ৬১৩° সেলসিয়াসে সাবলাইমেশন ঘটে। এটি বিদ্যুৎ পরিবাহিতা করতে সক্ষম হলেও তেমন ভালো পরিবাহী নয়।
আর্সেনিক অক্সিজেন, ক্লোরিন ও সালফারের সঙ্গে সহজে যৌগ গঠন করে, যেমন আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইড (As₂O₃), আর্সেনিক পেন্টঅক্সাইড (As₂O₅) এবং আর্সেনিক ট্রাইসালফাইড (As₂S₃)। প্রাকৃতিকভাবে এটি সালফাইড আকরিক যেমন আর্সেনোপাইরাইট (FeAsS), রিয়ালগার (As₄S₄) ও অরপিমেন্ট (As₂S₃)-এ পাওয়া যায়।
আর্সেনিক রাসায়নিকভাবে বিষাক্ত উপাদান হিসেবে পরিচিত এবং জৈব ও অজৈব উভয় রূপেই পাওয়া যায়। শিল্পক্ষেত্রে এটি কীটনাশক, কাঠ সংরক্ষণ, কাচ উৎপাদন ও মিশ্র ধাতু তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সর্বোপরি, আর্সেনিক প্রকৃতিতে মূলত দুটি রূপে পাওয়া যায়, অজৈব আর্সেনিক এবং জৈব আর্সেনিক।
জৈব আর্সেনিক তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিকর, যা মূলত সামুদ্রিক প্রাণীতে থাকে এবং মানবদেহে প্রবেশ করলেও তা দ্রুত বের হয়ে যায়। কিন্তু অজৈব আর্সেনিক হলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। পানিতে দ্রবণীয় অবস্থায় এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে পানির নলকূপে অজৈব আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার অনেক উপরে পৌঁছে গেছে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রতিদিনের পানীয় জলের মাধ্যমে অনিচ্ছাকৃতভাবে এই বিষ শরীরে নিচ্ছে।বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূগর্ভস্থ পানিদূষণ সমস্যা বলা হয়।
বিশ শতকের শেষভাগে যখন সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, তখন কেউ কল্পনাও করেনি যে সেই নলকূপের পানিতেই থাকবে এক মরণঘাতী বিষ। কয়েক দশক আগে যখন গ্রামীণ মানুষ পুকুর, নদী বা খাল থেকে পানি সংগ্রহ করত, তখন নানা ধরনের জীবাণুবাহিত রোগ যেমন কলেরা, আমাশয় বা টাইফয়েড সাধারণ ছিল।
সেই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে ব্যাপক হারে স্থাপন করা হয়েছিল গভীর ও অগভীর নলকূপ। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই দেখা গেল, নলকূপের পানি পান করা মানুষদের ত্বকে কালো দাগ, হাত-পায়ে শক্ত চামড়া ও নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে পানির ভেতরেই রয়েছে আর্সেনিক, যা ধীরে ধীরে মানবদেহকে গ্রাস করছে।আর্সেনিক বিষক্রিয়ার প্রভাব অত্যন্ত বহুমুখী।
প্রথম দিকে এটি ত্বকে চিহ্নিত হয়। হাতের তালু ও পায়ের পাতায় ছোট ছোট কালো বা সাদা দাগ দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সেই দাগ ছড়িয়ে পড়ে এবং চামড়া মোটা হয়ে যায়। পরবর্তীতে আর্সেনিক দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করতে থাকলে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে আর্সেনিক ত্বক ক্যানসার, ফুসফুস ক্যানসার, মূত্রথলি ক্যানসার এমনকি লিভারের ক্যানসারও সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়াও এটি স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ঘটায়, হাত-পা অবশ করে দেয় এবং হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। একজন ব্যক্তি যদি বহু বছর ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করেন, তবে তার আয়ুষ্কালও কমে যেতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো আর্সেনিকের ক্ষতি ধীরে ধীরে হয়, তাই এটিকে “নীরব ঘাতক” বলা হয়।
এই সংকটের সামাজিক প্রভাবও গভীর। গ্রামীণ এলাকায় যেসব মানুষের শরীরে আর্সেনিকজনিত চর্মরোগ দেখা দেয়, তারা অনেক সময় সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কারের শিকার হয়। তাদেরকে অনেকে সংক্রামক রোগী ভেবে এড়িয়ে চলে, যার ফলে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
বিয়ে-শাদির মতো সামাজিক সম্পর্কেও তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। আবার রোগাক্রান্ত ব্যক্তি শ্রমক্ষমতা হারিয়ে ফেললে পরিবার আর্থিক সঙ্কটে পড়ে।
ফলে আর্সেনিক কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকেও হ্রাস করছে।আর্সেনিক দূষণের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, নেপাল, ভিয়েতনাম, চীন, কম্বোডিয়া, চিলি ও মেক্সিকোর
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561, ইমেইলঃ news@kalerbiborton.com
© কালের বিবর্তন ২০১৯ - ২০২৪ সর্বসত্ব সংরক্ষিত