
মো. তাসলিম উদ্দিন সরাইল(ব্রাহ্মণবাড়িয়া): সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার( ইউএনও) মো. মোশারফ হোসাইন সরাইলের ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে জড়িত ইশা খাঁ-এর স্মৃতি বিজড়িত সরাইল উপজেলার সদর ইউনিয়নে নতুন হাবলি গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক আরিফাইল মসজিদটিতে আজকে আমার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়। সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল জব্বার এর আমন্ত্রণে মসজিদটিতে স্বাগত জানান উপস্থিত সকল মুসল্লি।
ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদটি শুধু একটি ইবাদতঘর নয়, বরং অতীত থেকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। মসজিদের পাশে অবস্থিত বিশাল পুকুর সাগরদিঘীর শান্ত পানির পাশে দাঁড়িয়ে আরিফাইল মসজিদের গম্ভীর আবহ যা প্রতীয়মান হয়, সেখানে গভীর শান্তি ও এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা মিশে রয়েছে।
দাঁড়িয়ে থাকা মাত্রই মনে হয় যেন দৃষ্টির চোখ আর হৃদয়ের অনুভব একাকার হয়ে এসে কথা বলছে। আর এখানেই সময় থেমে আছে, কিন্তু একই সঙ্গে এ মসজিদটি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যকার এক সেতু। মুঘল আমলের এই স্থাপত্যটি নির্মাণকালে প্রায় ১৬৬২ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি। অনেকের মতে ইউনেস্কোর তালিকায় উল্লেখিত স্থাপনাটি ১৬৭০ সালে নির্মিত।
গবেষকদের মতে, নির্মাণের প্রেক্ষাপট ছিল ধর্মীয় অনুভব আর শিল্পে নিপুণতার সমন্বয়। দরবেশ শাহ আরিফের নামানুসারে এই মসজিদের ‘আরিফাইল’ বা ‘আরিফিল’ নাম ধারণ করা। শুধু নামই নয় এটির সঙ্গে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চেতনার একটি বন্ধনও ঘটায়; যেন নামের প্রতিটি অক্ষর একেকটি সংকেত বহন করছে, নামের প্রতিটি বর্ণে মিশে আছে সেই দরবেশের স্মৃতি ও শ্রদ্ধা।ইউএনও উল্লেখ করেন,আরিফাইল মসজিদের আকারের কথা বললে অনায়াসে ক্লান্তি উঠানো সম্ভাব্য প্রায় ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩০ ফুট প্রস্থের মতো।
বর্তমানে “প্রায়” এই শব্দটি আসলে সময়ের বিবর্তনে কিছুটা ক্ষয়ের ইঙ্গিত বহন করে। তিনটি গম্বুজ, প্রতিটি একটি বিশিষ্ট উপাধি বা একজন ধর্মীয় অনুভবের প্রতীক মনে হয় এগুলো একত্রে মসজিদের অবকাঠামোকে মজবুত করেছে এবং তার স্থায়িত্বকেও নিশ্চয়তা প্রদান করছে। চার কোণায় অষ্টভুজাকৃতি বিশিষ্ট বুরুজ, একটি প্রাচীন দালানের আদলে প্রতিরক্ষামূলক আলংকারিক ছোঁয়া প্রদান করে, কিন্তু একই সঙ্গে মসজিদের সৌন্দর্য আর ভারসাম্য বজায় রাখে।
দেওয়ালের পুরুত্ব, প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি, স্পষ্টভাবে বোঝায় এই মসজিদ কোনও সাধারণ দৃষ্টিনন্দন ভবন নয়, এটি একটি কেলভ-শিল্পমন্ত প্রচেষ্টা: প্রতিটি পাথর, প্রতিটি ইট ধর্মীয় ভক্তি ও স্থাপত্য নৈপুণ্যের প্রতীক। প্রবেশ পথের সৌন্দর্য এবং অলংকার নজর কাড়ে। সাগরদিঘীর দিকে মুখরিত সেই প্রবেশদ্বার, খিলানযুক্ত সমস্যায় যেখানে চুন ও টাইলসের ব্যবহার হয়েছে, যা সত্যিই নজরকাড়া।
মসজিদের প্রবেশদ্বারের অলংকরণে যেমন ইসলামি নকশা রয়েছে, সেই সাথে স্থানীয় শিল্পের ছোঁয়াও লুকানো রয়েছে। টাইলসের ছাপ আর চুনের সূক্ষ্ম আতপক্রিয়া একত্রে মিশে একটি জ্যামিতিক বিন্যাসে পরিণত হয়েছে, যার চিত্রালোকে প্রতিটি কাঠামোগত দিক প্রাচীর, গম্বুজ, প্রবেশ পথ একেকটি গান যেমন সংলগ্ন একসাথে কথা বলেন।
ইউএনও আরোও উল্লেখ করেন, ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ শুধু স্থাপত্যের জন্যই নয়, স্থানীয় জনজীবনের কেন্দ্র হিসেবেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে হয়ে উঠেছে। মূলত প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের সুরক্ষিত সম্পদ বলেই এর যত্ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ চলে আসছে; তবে এটা থাকা অবস্থায় এখনও গ্রামের প্রতিদিনকার জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে আটকে আছে এই মসজিদ।
ঈদে বা বিশেষ প্রার্থনার সময় এটি শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে নয়, জীবন্ত ধর্মের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার হয়। স্থানীয় জনমানসে প্রাচীন কোনো ধর্মীয় স্থাপনার মতোই এই মসজিদে যাওয়া মানে এক ধরণের আত্মিক ভ্রামণ, যেখানে সেই পুরনো সময়ের সঙ্গে আজকের বাস্তব মিলেমিশে যায়।
মসজিদের সংলগ্ন এলাকায় একটি রহস্যময় “জোড়া কবর” এর কথা স্থানীয় লোককথায় আছে, যে দৃষ্টান্তটি ইতিহাস ও লোককাহিনীর মিশ্রণের এক অদ্ভুত উপস্থাপনা। কবর দুটোর বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য কমই পাওয়া গেলেও, প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে সেখানে সমবেত কোনো রহস্যজনক পদের দুই ব্যাক্তি সমাহিত। কবরগুলো হয়তো মসজিদের প্রতিষ্ঠাকালীন বা তাঁর কাছাকাছি সময়ে তৈরি, হয়তো কোনো দরবেশ বা সম্মানিত ব্যক্তি; এলাকাবাসী বিশ্বাস করে, “দু’জন একসাথে শুয়ে আছেন, আর তাদের অভিষেকে মসজিদটিও প্রতিষ্ঠিত।”
লোকসাহিত্যিক চেতনায় এই ধরনের দৈহিক নিদর্শন কতটা গভীরভাবে অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেই বাস্তবতা এখানে প্রতীয়মান হয়।ঐতিহাসিক মসজিদটির আধুনিক সংস্কার যেমন টাইলস এবং চুনের পুনঃব্যবহার সামঞ্জস্য বজায় রেখে করা হয়েছে, তবে আধুনিক উপকরণ (যেমন সিমেন্ট বা আধুনিক গন্ধ) অতিমাত্রায় ব্যবহার না করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সংরক্ষণ-নীতির সঙ্গে সর্বোচ্চ প্রাকৃত্য বজায় রাখতে চেষ্টার এক উদার নমুনা।
আজকের দিনে আমরা যখন প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণের কথা বলি, তখন যেমন স্থানীয় সংযম, শিল্প-সততা, এবং ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুণের সমন্বয় জরুরি, আরিফাইল মসজিদ সেই আদর্শের এক প্রতিফলন। মুঘল-মন্ডলে নির্মিত অন্যান্য মসজিদের তুলনায় দেখতে অনুরূপ হওয়ায় মসজিদটি মুঘল আর্কিটেকচারের ধারক অন্যান্য মসজিদগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব।
তবে আরিফাইল মসজিদ তার আকারে ছোট, কিন্তু শিল্পে এবং প্রযুক্তিগত কমপ্লেক্সিটির দিক থেকে অভিজাত। সরল কিন্তু ফিরে ভাবায়, ছোট হলেও গভীর প্রভাব ফেলে।মসজিদটি দেখার ব্যাপারে কিছু উপকারী পরামর্শ দেওয়া যায়। স্মরণ রাখতে হবে, মসজিদটি একটি প্রত্নসম্পদ; সেজন্য সতর্কতার সঙ্গে প্রবেশ করা উচিত যথাযথ পোশাক, শান্তিপূর্ণ আচরণ এবং কোনও অবাঞ্ছিত ছোঁয়া বা বিকৃতি না করাই উত্তম।
উল্লেখ্য সাগরদিঘীর পারে বসে ষৎস্রোতের শব্দ, টানাপোড়েনের শব্দ, গম্বুজগুলোর অদ্ভুত প্রতিবিম্ব সব মিলে একটি এমন আবহ তৈরি করে যা স্মৃতির আকাশে আঁচড় হয়ে যাবে। যাঁরা আর্কিটেকচার বা ইতিহাসে আগ্রহী, তাঁদের কাছে এখানে প্রতিট
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে ৫ নারী...
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর...
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের নির্দেশ
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের...
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২৫...
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও...