হারিয়ে যাওয়া শৈশব, বিলুপ্তপ্রায় মাছ আর গ্রামবাংলার রান্নাঘর

প্রকাশিত: ৫:২৬ অপরাহ্ণ , ১৮ জুন ২০২৫, বুধবার , পোষ্ট করা হয়েছে 12 months আগে
ছবি- কালের বিবর্তন

সোহেল চৌধুরী রানা, সাপাহার (নওগাঁ): এক সময় বর্ষাকাল মানেই গ্রামবাংলার বাড়ির উঠোনে কিংবা রান্নাঘরের পাশে বসে দেশি ছোট মাছের গন্ধে ভরে যেত চারদিক। পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর লেবুপাতার ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে যেত গোটা পরিবার। মাটির চুলায় আঁচে রান্না হওয়া সেই বেলে মাছের চচ্চরি, পুঁটির তরকারি কিংবা তিতপুঁটির জাল—সব যেন ছিল জীবনের সরল সুখের নাম।

তখনকার সেই রান্না শুধু খাবার ছিল না, ছিল উৎসব। চুলার পাশেই পিঁড়িতে বসে গরম ভাতের সঙ্গে ছোট মাছ মেখে খাওয়ার মুহূর্তগুলো ছিল আনন্দময় মিলনের চিত্র। মায়েদের হাতের রান্নায় যেমন ছিল পুষ্টি, তেমনি ছিল প্রাকৃতিক উপাদানের জাদু।

আজ সেই দেশি মাছগুলোর অনেকটাই স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। পুঁটি, তিতপুঁটি, দারকিনা, মলা, গুতুম, বেলে, খলসে, চান্দা, মৌরালি, চিড়াতি, উড়ুয়া, মেনি, ভাংনা, টাকি, খরকেটি—এসব নাম আজ অনেকেই শুনেননি। আমাদের ছোটবেলার খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপের ফাঁকে খালের পাড়ে কিংবা পাটক্ষেতে মাছ ধরার যে আনন্দ ছিল, তা এখন কেবল গল্প হয়ে থাকছে।

শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে জুয়েল হক বলেন,“এই তো গেল কয়েক বছর আগের কথা। ধান লাগানোর জন্য যখন হাল চাষ করতেন কৃষকরা, আমরা এক হাতে ঝাঁকা বা খৈচিলা আর অন্য হাতে খলই নিয়ে সেই হালির পিছনে পিছনে দৌঁড় দিতাম। দারকিনা, পুঁটি, টাকি, কৈ, খলিশাসহ নানা জাতের মাছ পেতাম। আহ্ কি যে আনন্দ! সত্যিই আমরা হারিয়ে ফেলেছি অনেক কিছুই।”

প্রবীণ গৃহবধূ লিলুফা ইয়াজমিন চৌধুরী বলেন,

“আগে বর্ষাকালে খালবিল আর পুকুর ভরে থাকত ছোট মাছ দিয়ে। আমরা তখন আলু, বেগুন, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর একটু লেবুপাতা দিয়ে বেলের চচ্চরি করতাম। গরম ভাতের সঙ্গে সে স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। কিন্তু এখন এসব মাছ বাজারে মেলে না, আর ঘরে তো দূরের কথা।”

জবই বিল জীববৈচিত্র্য ও সমাজ কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সোহানুর রহমান সবুজ বলেন,

“জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ শুধু পরিবেশ নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও খাদ্য নিরাপত্তার সাথেও জড়িত। একসময় ছোট মাছ ছিল গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের পুষ্টির উৎস। এখন তা হারিয়ে যাচ্ছে। দেশি মাছের বিলুপ্তির পেছনে মূলত দায়ী হচ্ছে পোনা ও মা মাছ ধরা এবং অভয়াশ্রম না থাকা। এই অবস্থায় খাল-বিল, নদী-নালার পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয়ভাবে দেশি মাছের চাষে তরুণদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। তবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সাফল্য সম্ভব নয়।”

স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল চৌধুরী রানা আরও বলেন, দেশি মাছের এই সংকটের পেছনে রয়েছে নানা কারণ। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক জলাধারের অব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক দূষণ, অপরিকল্পিত চাষাবাদ এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক—মা মাছ ও পোনা মাছ নিধন।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন একযোগে সরকারি, বেসরকারি ও জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ। ছোট মাছের পুষ্টিগুণের প্রচার, স্থানীয় মৎস্য খামারিদের সহায়তা, প্রাকৃতিক জলাধারে মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিশুদের মাঝে মাছ ধরার ঐতিহ্যকে গল্পে-ছবিতে ধরে রাখাও হতে পারে একটি সামাজিক আন্দোলনের অংশ।

প্রাচুর্য না থাকলেও একসময় ছিল প্রশান্তি। কাঁসার থালায় পুঁটির চচ্চরির পাশে আলুভর্তা আর গরম ভাতে একচিমটে ঘি মেখে খাওয়ার স্মৃতি এখন শুধু হৃদয়ে। তবু আমরা যদি চাই, এখনো হয়তো রক্ষা করা সম্ভব আমাদের নদী-খাল, বিলুপ্তপ্রায় ছোট মাছ আর সেই প্রাণবন্ত গ্রামবাংলার রান্নাঘর।