লোকসাহিত্যের নিরলস সাধক রওশন ইজদানী প্রয়াণদিবসে নেই কোনো আয়োজন

প্রকাশিত: ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ , ২৩ জুন ২০২৫, সোমবার , পোষ্ট করা হয়েছে 12 months আগে
ছবি- কালের বিবর্তন

মজিবুর রহমান : বাংলা লোকসাহিত্য, পল্লীসংস্কৃতি ও বাউল ভাবধারার একনিষ্ঠ সাধক কবি রওশন ইজদানীর আজ প্রয়াণদিবস। ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন তিনি চিরবিদায় নেন। অথচ জন্মভূমি কেন্দুয়ায় আজ নেই কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন, নেই সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্মরণানুষ্ঠান। যেন এক সময়ের দীপ্ত সাহিত্যপ্রতিভা ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে বিস্মৃতির পর্দায়।

গ্রামীণ মাটিতে শিকড় গাঁথা এক কবি :

নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বিদ্যাবল্লভ গ্রামে ১৯১৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন রওশন ইজদানী। পিতা শেখ আলী কবির ও মাতা আতিফুন্নেছা। শৈশবেই বাবাকে এবং কিছুদিন পর মাকেও হারান। এই বেদনাবিধুর জীবন তাঁর মধ্যে জন্ম দেয় আত্মজিজ্ঞাসা ও অন্তর্মুখী সাহিত্যবোধ।

আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন দীর্ঘ না হলেও বাউল-ভাববাদ, লোকজ গান ও পল্লীসংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে নিয়ে যায় লোকসাহিত্যের গভীর অন্বেষায়। জীবনের শুরুর দিকে তিনি কিছুদিন বাউলদের সঙ্গে ঘুরে গান করেন, পরবর্তীতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমাজজীবনে প্রত্যাবর্তন করেন।

পেশাগত জীবনের বাইরে সাহিত্যচর্চায় সম্পূর্ণ নিবেদিত:

প্রথমে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা করেন তিনি। এরপর কাজ করেন ‘দৈনিক আজাদ’-এর রিডিং সেকশনে এবং পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনে প্রুফ রিডার হিসেবে। কিন্তু রোগব্যাধির কারণে দীর্ঘ সময় চাকরি ধরে রাখতে পারেননি। এসব সীমাবদ্ধতাই তাঁকে সাহিত্যচর্চার দিকে স্থায়ীভাবে টেনে আনে। এক সময় তিনি নিবিষ্ট হন কবিতা, প্রবন্ধ ও লোকসাহিত্য গবেষণায়।

লোকসাহিত্যের গবেষণায় অগ্রদূত:

বাংলা লোকসাহিত্যের গবেষণায় রওশন ইজদানীর নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হয়। তাঁর রচিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ হলো:
“মোমেনশাহীর লোক সাহিত্য”
“পূর্ব পাকিস্তানের লোক সাহিত্য”
এই গ্রন্থগুলোতে তিনি পূর্ববাংলার গ্রামীণ জীবনের বিশ্বাস, রীতি, কাহিনি ও সমাজচিত্র তুলে ধরেছেন নিবিড় অনুসন্ধানে। তিনি কেবল সংগ্রাহক ছিলেন না, ছিলেন বিশ্লেষকও। তাঁর রচনায় বাংলা লোকজীবনের অন্তরসত্তা ধরা দেয় গভীর মমতায়।

কাব্যেও ছড়িয়ে আছে লোকজ সুর ও ভাববাদ :

রওশন ইজদানীর কাব্যপ্রতিভাও ছিল বিস্ময়কর। তাঁর কবিতায় যেমন আছে আধ্যাত্মিক ভাব, তেমনি আছে মাটির মানুষের যাপন। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—বজ্রবাণী (১৯৪৭), চিনু বিবি (১৯৫১), রঙ্গিলা বন্ধু (১৯৫১), খাতামুন নাবীঈন (১৯৬০), ইউসুফ জুলেখা। “খাতামুন নাবীঈন” কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৬০ সালে লাভ করেন আদমজী সাহিত্য পুরস্কার। নবীজীবনভিত্তিক এই মহাকাব্য পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়।

তাঁর রচিত শিশুসাহিত্যের চরণ আজও গ্রামীণ আবহে উচ্চারিত হয়:

“সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, বেলা গেল ঐ / কোথায় গেল হাঁসগুলো তৈ তৈ তৈ”
এই পঙ্‌ক্তিমালায় মেলে বাংলার শিশুতোষ সাহিত্যের কোমল স্বর।

“রওশন ইজদানী একাডেমী”, অতঃপর বিস্মৃতি :

এক সময় কেন্দুয়ার বিদ্যাবল্লভ গ্রামে তাঁর স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠে “রওশন ইজদানী একাডেমী”। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে পালিত হতো তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে আয়োজন হতো কবিতা পাঠ, আলোচনাসভা, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা ও লোকসংগীতের আসর।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দিন দিন এসব আয়োজন হারিয়ে গেছে জনচেতনার আড়ালে। আজকের দিনে তাঁর স্কুলে নেই কোনো স্মরণসভা, নেই কোনো সাংস্কৃতিক উদ্যোগ। স্থানীয় প্রশাসন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
সম্ভবত, পরিবারের পক্ষ থেকে ছোট পরিসরে কোনো পারিবারিক আয়োজনের মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়েছে—এমনটাই জানা গেছে স্থানীয় সূত্রে। তবে একসময় যে কবিকে কেন্দ্র করে কেন্দুয়া কেঁপে উঠতো সংস্কৃতির আবেগে, সেই একই কেন্দুয়া আজ নিরব, নির্বাক।

“একজন রওশন ইজদানীকে ভুলে যাওয়ার দায় কার”?

লোকসাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে রওশন ইজদানী নিছক একটি নাম নয়, বরং এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণপুরুষ, যিনি বাংলার মানুষ, তাদের ভাষা, বিশ্বাস, প্রেম, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে ধারণ করেছেন শব্দে-সুরে-গবেষণায়। অথচ তাঁর প্রয়াণদিবসে এমন নিরবতা নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক।

যে জাতি তার শিকড়কে ভুলে যায়, সে জাতির সংস্কৃতি হয় পাথরের মতো নীরস। আজ যখন লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনের ভাষায়, তখন রওশন ইজদানীর মতো সাহিত্যিকদের স্মরণই হতে পারে প্রতিরোধের পথ।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নিবেদন:

রওশন ইজদানীর সাহিত্যকীর্তি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি, তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করা, তাঁর নামাঙ্কিত একাডেমির উন্নয়ন, ও সরকারি উদ্যোগে বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠান আয়োজনের দাবি এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

#########
০১৯১৭৯৮৪৮২৯
২৩/৬/২৫