সরাইলে মাদকের থাবার শিকার স্থানীয় যুব সমাজ!!ধরা-ছোয়াঁর বাইরে মূলহোতারা

প্রকাশিত: ১:২৫ অপরাহ্ণ , ২৪ মে ২০২৫, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 1 year আগে
ছবি- কালের বিবর্তন

মো: তাসলিম উদ্দিন,সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইলে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে ও পাড়া-মহল্লায় মাদক ব্যবসা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমগ্র উপজেলা সমুহজুড়ে জুয়া ও মরণনেশা মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে। এখানে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা,হিরোইন, ফেনসিডিল,ড্যান্ডি ,গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। জুয়া ও মাদকে আসক্ত হয়ে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় যুব সমাজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যাচ্ছে।

কিছু চিহ্নিত জুয়া ও মাদক কারবারিসহ অনেক রাঘব বোয়াল এ ব্যবসার সাথে জড়িত। এমনকি দশ বছরের শিশুদের ভেতরেও ড্যান্ডি নামক মাদক সেবনের প্রবনতা দেখা গেছে।দিনের পর দিন তারা এই নিষিদ্ধ কর্মকান্ড পুরোধমে চালিয়ে আসলেও রহস্যজনক কারণে জুয়া ও মাদক কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সমাজে বেড়েছে চুরি কিশোর অপরাধ বাড়ছে মাদকের কারণে।

পরিবারগুলোতে বাড়ছে অশান্তি। টাকা না পেয়ে বাবা-মাকে মারধর ও ভরণপোষণ না দেওয়ার ঘটনায় অভিযোগ জমা হচ্ছে উপজেলা প্রশাসনেও থানায় একের পর এক মামলা হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও সমাজে অপরাধ এবং মাদক গ্রহণের হার বেড়েই চলেছে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে তরুণদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে কে? পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা মাদকের ছোবলে হয়ে যাচ্ছে আসক্ত।খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মাদকের ব্যবসা হচ্ছে তিনটি ধাপে। একটি দল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আসা মাদক নিয়ে আসে শহরে। তারা পৌঁছে দেয় শহরের এজেন্টদের কাছে। এজেন্টরা বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে খুচরা বিক্রেতাদের দিয়ে এসব মাদক বিক্রি করায়।

দরিদ্র পরিবারের নারী ও শিশুদের মাদক বিক্রি , পরিবহন ও খুচরা বিক্রির কাজে ব্যবহার করছে নেপথ্যের হোতারা।তারা থেকে যাচ্ছে আইনের নাগালের বাইরে। বিশ্বরোড় চত্বর থেকে মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায়। তাই অনেকে বিশ্বরোড’কে মাদকের রাজ্য বলে।সরাইলের যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

আর এ জন্য সক্রিয়ভাবে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ২০২৫ সাল থেকে গত মার্চ মাস থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সরাইল থানায় মাদক আইনে মামলা হয়েছে ৯টি। মামলাগুলোতে গ্রেপ্তার হয়েছে ১৬ মাদকসেবী ও বিক্রেতা। এ সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৩৩ কেজি ৮শ’ গাঁজা,৩৬৫-ইয়াবা ট্যাবলেট ও ৩০ স্কক বোতল।

উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে বহুল আলোচিত ইয়াবা, গাঁজা, স্কক বোতল। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুধু খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানা এলাকায় পুলিশ ২টি মামলায় ৫ মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় উদ্ধার ৫২ কেজি গাজা ।আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বেরিয়ে ফের মাদক কারবার ও সেবনে জড়িয়ে পড়ছে অপরাধীরা।জানা গেছে প্রথমে সিগারেট ওগাঁজা দিয়ে শুরুকরলেও ইয়াবা ও ফেনসিডিল গ্রহণের মাত্রা সরাইলে সবচেয়ে বেশি।

ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ নামক আঠালো পদার্থ স্থানীয়ভাবে ‘ড্যান্ডি গাম’ নামে পরিচিত। জুতা মেরামতে ব্যবহারের এই গামকে মাদক হিসেবে গ্রহণ করছে অনেকেই। একটানা দুই বছর ড্যান্ডি গ্রহণ করলে মানসিক ভাবে বিকার গ্রস্ত হয়ে যায় সেবীরা। সরাইল উপজেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. আরিফুল ইসলাম সুমন বলেন, একজন মাদক একাই ব্যবসা করে না। এদের সঙ্গে সমাজের অনেক রাঘববোয়ালরাও জড়িত।

রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে অনেকের সখ্য থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই ব্যবসার পরিধি বাড়ছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।এ বিষয়ে সরাইলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান গণের সাথে কথা হলে তারা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সীমান্তবর্তী এলাকা এই এলাকায় সরাইলে মাদক-ঢুকে অতি সহজে।

এই অবস্থাকে রুখতে হলে। সচেতনতা বাড়াতে হবে,শিক্ষার্থীদের ক্লাসে শিক্ষকরা মাদকের ( ক্যাম্পেইন করে) নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে। সুধীজন,গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তি সবাইকে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে সমাজের প্রতি স্তরে। তারা বলেন, এই অবস্থায় সকলের উদ্যোগ প্রয়োজন।

মাদকের কারণে সরাইলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা কিশোরদের বিপদের পথে নিচ্ছে। তবে সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা।

সরাইল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী মো.নুরুজ্জামান লস্কর তপু বলেন, বর্তমানে গ্রাম অঞ্চলেও চড়িয়ে পড়েছে মাদক।সরাইলে মাদকের সয়লাব। এ অবস্থা থেকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান পরিচালনা করা দরকার। অনেক মাদক ব্যবসায়ীরা তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে থাকে।

তাদের বিরুদ্ধে পুলিশকে আরো সক্রিয়ভাবে মাঠে নামতে হবে। মাদককের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে জন প্রতিনিধি, সমাজসেবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মাদকবিরোধী সেমিনার করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলে মাদক থেকে মানুষ মুক্তি পাবে।

খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মো. মামুন রহমান এ প্রতিনিধিকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে হাইওয়ে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।

এ ব্যপারে সরাইল থানা অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মো.রফিকুল হাসান এ প্রতিনিধিকে বলেন,ডাকাত ও দাঙ্গা নিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে মাদকের ব্যাপারে কোন প্রকার ছাড় নাই। মাদকা সক্তদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েক জনকে আটক করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে।ওসি বলেন, মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স।

সম্প্রতি উপজেলা আইন শৃঙ্খলা সভায় বক্তারা দাবি করে বলেন।সরাইলে মাদক যেভাবে ভয়াবহতা সৃষ্টি করেছে। এখন যুব সমাজকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে বক্তব্যে বলেছেন, এই মাদকের সাথে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জড়িত। যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে।

মাদকের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের পাশাপাশি পুলিশি অভিযান বাড়াতে হবে।মাদকের বিস্তারে নারী ও শিশুদের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবার আমদানি, সরবরাহ ও বেচাকেনার জন্য নিরাপদ হিসেবে নারী ও শিশুদের বেছে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষরা ব্যর্থ হওয়ায় তাদের পরিবারের ভাড়া করা নারী ও শিশুদের নামাচ্ছে এ ব্যবসায়।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের নারী ও শিশুরা অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য জড়াচ্ছে মাদক ব্যবসায়। বর্তমানে দেশে ইয়াবার প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় নারী মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সরাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো.মোশারফ হোসাইন বলেন,মাদক কারবারি যেই হোক তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে। সচেতনতা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। মাদক সামাজিক সমস্যা।

এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করে থাকে। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যে মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হবে। মাদকের বিষয়ে পরিবারের অভিভাবকরা অভিযোগ করছে। মাদকের কারণে পারিবারিক অশান্তি বেড়েছে।