
জামাল হোসেন পান্না,নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে যেন মিষ্টি আলুর এক ছোট রাজ্য। তিতাস আর মেঘনার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই উপজেলার মাটি কৃষি উৎপাদনের জন্য দারুণ উপযোগী। এখানকার কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের ফসলের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন, যার মধ্যে মিষ্টি আলু অন্যতম। বিশেষ করে নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নে মিষ্টি আলুর ব্যাপক চাষাবাদ হয়।
নবীপুর, লাপাং, চর লাপাং, দড়িলাপাংয়ের মতো গ্রামগুলোতে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে এখন শুধু মিষ্টি আলুর সমারোহ। এছাড়াও বীরগাঁও, কৃষ্ণনগর, সলিমগঞ্জ এবং পৌর এলাকার অনেক জায়গায় এই ফসলের চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এখানে প্রায় ২২৮ হেক্টর জমিতে মিষ্টি আলুর চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ হেক্টর বেশি। কৃষি বিভাগের ‘কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্প’ এবং ‘ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমারজেন্সি এসিসট্যান্স প্রজেক্ট’-এর অধীনে কৃষকদের সরাসরি সহায়তা করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া হচ্ছে নতুন জাতের কাটিং, আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।
কন্দাল ফসল উন্নয়ন প্রকল্পের হাত ধরে গত তিন বছর ধরে নবীনগরে জাপানি মিষ্টি আলু “ওয়াকিনাওয়া”-র চাষ শুরু হয়েছে। এই আলু রপ্তানির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। ২০২১-২২ অর্থবছরে কৃষি বিভাগ থেকে ৫ জন কৃষকের মধ্যে এই আলুর কাটিং সরবরাহ করা হয়েছিল। চলতি বছরে এই জাতের মিষ্টি আলু চাষ করে চর লাপাং এবং নবীপুরে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে এর বিস্তার ঘটানো হয়েছে।
স্থানীয় আলুর চেয়ে এই ওয়াকিনাওয়ার আকার বেশ বড় এবং এর ভেতরের অংশ কমলা রঙের। স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ এই মিষ্টি আলুকে “গাজর আলু” নামেই বেশি চেনেন। শুধু নবীনগর নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের মতো অন্যান্য উপজেলাতেও নবীনগরের কাটিং নিয়ে মিষ্টি আলুর চাষ করছেন কৃষকরা।
চর লাপাং গ্রামের কৃষক অহিদ মিয়া জানান, স্থানীয় জাতের আলুতে উৎপাদন কম হয়। তবে ওয়াকিনওয়া জাতের মিষ্টি আলুর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ এবং এতে রোগবালাইও কম হয়। কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে আমাদের পরামর্শ দিচ্ছে। আমরা এই জাত নিয়ে খুবই আশাবাদী।
নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি অফিসার আকলিম বেগম এনি জানান, আমরা স্থানীয় জাতের আলু পরিবর্তন করে আধুনিক জাতের বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করছি। কাটিং উৎপাদন বৃদ্ধি করতে কৃষকদের নিয়ে আমরা সারাবছর কাজ করি। এই ফসল নদীর কাছাকাছি হওয়ায় পরিবহন ও সেচের সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি মন আলু গড়ে ১০০০ টাকা দরে বিক্রি করা যাচ্ছে।
নবীপুর গ্রামের কৃষক নুরুল আমীন জানান, এই মাটিতে মিষ্টি আলু চাষ করে আমরা বেশ লাভবান। কম খরচে ভালো ফলন পাচ্ছি। প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ মন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। অন্য ফসলের তুলনায় এর উৎপাদন বেশি, আর বাজারদরও ভালো।
উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, মিষ্টি আলু আমাদের খাদ্যচক্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। এটি হজমশক্তি বাড়ায় এবং এর পুষ্টিগুণও অনেক। এটি লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত খাবার হওয়ায় সব বয়সের মানুষের জন্য উপযোগী। বারি মিষ্টি আলু ৯, বারি মিষ্টি আলু ১৩ এবং ওয়াকিনওয়া জাতের আলু এখানে বেশ জনপ্রিয়।
এর মধ্যে রপ্তানির সম্ভাবনা থাকায় আমরা ওয়াকিনওয়া জাতের আলু নিয়ে বেশি কাজ করছি। এই মিষ্টি আলু চাষের বিস্তার ঘটাতে পারলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। আগে স্থানীয় জাতের মিষ্টি আলুতে তেমন পুষ্টিগুণ ছিল না। ওয়াকিনাওয়া জাতের আলুতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করে এবং উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
এইসব উদ্যোগের ফলে নবীনগরের কৃষিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মন্তব্য লিখুন
আরও খবর
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে ৫ নারী...
কমলগঞ্জে চা পাতা তুলতে গিয়ে বজ্রপাতে...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত...
হাম ও উপসর্গে আরো ১৩ শিশুর...
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
সাদা পোশাকে মুগ্ধতা ছড়ালেন অপু বিশ্বাস
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের নির্দেশ
চন্দ্রা এলাকার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের...
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
যেকোনো ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবো : প্রধানমন্ত্রী
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ২৫...
শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে মেডিকেল ও...