ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মাণাধীন ‘বীর নিবাস' এর নির্মাণ কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করার অভিযোগে ইতিমধ্যে প্রশাসনের নির্দেশে উপজেলার চিত্রী গ্রামে বীর নিবাসের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে গত ১২ দিন ধরে বীর নিবাসের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে চিত্রী গ্রামের বীর নিবাস পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা পান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তানভীর ফরহাদ শামীম।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুজিব বর্ষে প্রধানমন্দ্রীর উপহার হিসেবে অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ প্রকল্পের (বীর নিবাস) আওতায় সারাদেশের ন্যায় নবীনগর উপজেলায় তিন ধাপে মোট ২২৮টি বীর নিবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এ উপজেলায় ইতিমধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১২টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৫টি বিল্ডিং নির্মাণ করে স্থানীয় অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, প্রাক্কলন অনুযায়ী একতলা ছাদ বিশিষ্ট প্রতিটি বীর নিবাসে থাকবে তিনটি বেডরুম, একটি গেস্টরুম, দুটি বাথরুম ও একটি কিচেন রুম। এ ছাড়া থাকবে বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সুব্যবস্থা। এতে প্রতিটি ঘরের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন, তদারকি ও দেখ ভালের দায়িত্ব পাওয়া উপজেলা পিআইও অফিস সূত্র জানায়, এ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে এখন এ উপজেলায় আরও ১৩১টি বীর নিবাস নির্মাণের কাজ চলছে। এরমধ্যে দুটি প্যাকেজে ১ কোটি ৪০ লক্ষাধিক টাকা ব্যায়ে পাঁচটি করে মোট ১০টি ঘর নির্মাণের কার্যাদেশ পায় স্থানীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সোনিয়া এন্টারপ্রাইজ। যারমধ্যে উপজেলার নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের চিত্রি গ্রামে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার পেশকার মিয়ার বীর নিবাসটির নির্মাণের দায়িত্ব পায় এই সোনিয়া এন্টারপ্রাইজ।
গত সোমবার চিত্রি গ্রামে সরজমিনে গিয়ে নির্মাণাধীন 'বীর নিবাস' এ গেলে, স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ওই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার পেশকার মিয়ার নামে বরাদ্দ দেয়া বীর নিবাসের নির্মাণ কাজে নিম্নমানের ইট বালু সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে।
গ্রামবাসি জানান, ১৪ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে দেড় মাস আগে এই বীর নিবাসের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর অভিযোগ, ভালো মানের ইট বালু দিয়ে বিল্ডিংটি 'মজবুত' করে দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে দু'দফায় নগদ ৫১ হাজার টাকাও নেন ঠিকাদার। কিন্তু এরপরও ঘরটি নির্মাণে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। এ অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করা হলে, প্রশাসনের লোকজন এসে গত ৫ অক্টোবর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়ে যান।
এ বিষয়ে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা পেশকার মিয়ার বৃদ্ধা স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৭০) বলেন,'ঠিকাদার লিয়াকত মিয়া বিল্ডিংডা তৈরীর সময় উন্নত মানের ইট বালু কিনার কথা কইয়া কিছুদিন আগে আমার কাছ থাইক্যা দুইবারে মোট ৫১ হাজার টাকা নিছে। কিন্তু এরপরও এই ব্যাডা (ঠিকাদার) বিল্ডিংডার মধ্যে খুব বাজে কাম করায় বিল্ডিংয়ের ইট ধরলেই খুইল্যা যায়।'
চিত্রি গ্রামের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার আবদুল লতিফ, গ্রামের বাসিন্দা শামসু মিয়া, স্বপন মিয়া সহ একাধিক ব্যক্তি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন,'বীর নিবাসের জন্য কোটি কোটি টেহা দিতাছে সরকার। তাইলে ঠিকাদার নগদ ৫১ হাজার টেহা মুক্তিযোদ্ধার বউয়ের কাছ থাইক্যা নিব ক্যান, কন? এরপরও কাম হইতাছে খুবই খারাপ। তাই আমরা এর প্রতিকার চাই।'
এদিকে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমানসহ বীর নিবাসে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা খোজে পান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর ফরহাদ শামীম।
পরে সেখানে উপস্থিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী লিয়াকত আলীকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন,' বীর নিবাস নির্মাণে সিডিউল মানা না হলে বিল বন্ধ থাকবে। এক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার নির্মাণ কাজে সন্তুষ প্রকাশ আমাদের লিখিত প্রত্যয়ণ প্রদান করলেই কেবল বিল প্রদান করা হবে। এ সময় তিনি ঠিকাদারকে ভতসনা করেন।
এ বিষয়ে সোনিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারী ঠিকাদার লিয়াকত আলী বলেন,'রাজমিস্ত্রিরা এই বীর নিবাসের নির্মাণ কাজ করার সময় কিছুটা ত্রুটি ধরা পড়ায়, পিআইও অফিস থেকে লোক গিয়ে কিছুদিন আগে কাজটি বন্ধ করে দেয়। তবে আমি কথা দিচ্ছি, ইউএনও সাহেবের কার্যাদেশের সিডিউল অনুযায়িই খুব ভালো করে এই বিল্ডিংয়ের পুরো কাজটা শেষ করবো ইনশাল্লাহ।' তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীর কাছ থেকে ৫১ হাজার টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,'এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।'
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ জহির রায়হান
প্রধান কার্যালয়ঃ ১০৭ মতিঝিল বা/এ, ৯ম তলা, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ 01713-733969, 01924-665561, ইমেইলঃ news@kalerbiborton.com
© কালের বিবর্তন ২০১৯ - ২০২৪ সর্বসত্ব সংরক্ষিত