সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর সোপান স্যার

প্রকাশিত: ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ , ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 10 months আগে
অধ্যক্ষ সোপানুল ইসলাম সোপান
সাক্ষাৎকার শেষে অধ্যক্ষ সোপানুল ইসলাম সোপান স্যারের নিজ কার্যালয় থেকে ছবিটি তোলা। ছবি : জহির রায়হান

জহির রায়হান :  যান্ত্রিক এ যুগে মানুষ বড়ই আত্মকেন্দ্রিক। নিজের জগত নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় অন্যকিছু নিয়ে ভাবার সময় কারোর নেই। স্বার্থপর পৃথিবীতে নিজস্বার্থ ছেড়ে নিস্বার্থ হওয়া সাদা মনের মানুষ পাওয়া ভার। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতায়ও কিছু মানুষ থাকে যাঁদের জন্যই বোধকরি এগিয়ে যাবার আলো দেখতে পাই। তেমনি একজন আলোকিত মানুষ অধ্যক্ষ সোপানুল ইসলাম সোপান স্যার। যিনি শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

শিষ্টাচার, ক্ষমাশীল ও কর্তব্যপরায়ণ এই তিনটি শব্দের সমন্বয়ে একজন শিক্ষক। একজন আদর্শবান শিক্ষক হতে হলে এই তিনটি গুণ তার মধ্যে অবশ্যই থাকতে হবে। তা না হলে তিনি কখনোই একজন আদর্শবান শিক্ষক হতে পারবেন না। ‘কালের বিবর্তনে’ দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই প্রতিবেদকের সাথে এমনটিই বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইডিয়াল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সোপানুল ইসলাম সোপান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাইকপাড়ায় অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের নিজ কার্যালয়ে প্রায় ঘন্টাব্যাপি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অধ্যক্ষ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন এই প্রতিবেদকের সাথে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন আদর্শবান এই অধ্যক্ষ। পরিবারে বাবা মনিরুল ইসলাম এবং মা মমতাজ বেগম দম্পত্তির এক ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনিই সবার বড়।

শিক্ষাগত যোগ্যতায়ও তিনি ১৯৯৩ সালে M.Com (Management), ২০০০ সালে M.A (English). Bachelor in ELT এবং ২০০৫ DHMS (Homeo) ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি English Pioneer / Supanul Islam Supan নামক দু’টি ইউটিউব চ্যানেল চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজন মত শেখার সব উপকরণ পেয়ে থাকেন।

‘শিক্ষক’ এই তিনটি শব্দের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি যতদূর জেনেছেন তা থেকে বলেন, আমরা যদি এই তিনটি শব্দকে আলাদাভাবে বলি তাহলে শি= শিষ্টাচার, ক্ষ= ক্ষমাশীল এবং ক= কর্তব্য পারায়ণ।

শি= শিষ্টাচার; যা একজন শিক্ষকের বড় গুণ। শিষ্টভাব থাকতে হবে তাঁর আচার-আচরণে। তিনি শিষ্টাচার মেনে চলবেন। আমরা শিক্ষকরা যখন ক্লাসে যাবো তখন অবশ্যই আমরা পাঞ্চোয়ালেটি বা সময়ানুবর্তিতা মেইনটেইন করবো। যেমন আমি যথাসময়ে ক্লাসে যাবো এবং আমি আমার ক্লাসের পড়াটা লেসন প্ল্যান করে নিয়ে যাবো। আমি যখন ক্লাসে লেকচার দিবো তখন আমি আমার স্টুডেন্টদের পড়াটা আগে থেকেই পড়ে যাবো। আমি যখন স্টুডেন্টদের কোনো বিষয়ে পড়াতে যাবো আমার মনোযোগ থাকবে ক্লাসের পরিবেশের দিকে যেমন ক্লাসে আলো, বাতাস ঠিক আছে কিনা। অর্থাৎ ক্লাসে যাতে কোনো শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সৃষ্টি না হয়। তারা যেনো আমার লেকচারটা ভালোভাবে বুঝতে পারে।

ক্ষ= ক্ষমাশীল, একজন শিক্ষককে অবশ্যই ক্ষমাশীল মানসিকতা সম্পন্ন হতে হবে। তা না হলে একজন শিক্ষক কখনোই তাঁর শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষা দিতে পারবেন না। দেখা যায় অনেক সময়ই ক্লাস চলাকালীন সময়ে অনেক শিক্ষার্থীই ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে যান অথবা ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে শিক্ষক যদি তাঁর শিক্ষার্থীকে মারধর না করে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হোন যে, নিয়মিত ক্লাসে এসে মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করলে তার জীবনে কী কী উন্নতি করা সম্ভব এবং তার মা-বাবার কী কী স্বপ্ন জড়িয়ে আছে তার এই শিক্ষার সাথে। তাহলেই সে শিক্ষার্থী নিজেকে বদলাবে এবং ওই শিক্ষকের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ আরো বেড়ে যাবে।

সবশেষে ক= কর্তব্য পারায়ণ। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমরা শিক্ষকরা যখন ক্লাসে যাবো তখন আমাদের ব্যবহৃত মোবাইলগুলো সাইলেন্ট মোডে রাখবো অথবা বন্ধ করে আমরা ক্লাসে যাবো। ক্লাসে গিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডটাকে সাজিয়ে নেবো। যতোটুকু সময় আমি পড়াবো খুব ভালোভাবে পড়াবো যেনো শিক্ষার্থীদের কোনো কিছু বুঝতে কষ্ট না হয়। শিক্ষার্থীরা যখন আমাদেরকে তাদের খাতা দেখতে দেবে তখন আমরা তার খাতাটা পূর্ণাঙ্গভাবে দেখবো। অনেক সময় দেখা যায় যে, শিক্ষকরা অল্প পড়েই মার্ক করে দেন। এক্ষেত্রে সমস্যা হয় কি, শিক্ষার্থীরা যখন বাসায় গিয়ে দেখে তার লেখায় আরো তিন চারটা ভুল আছে এবং তাঁর শিক্ষক ভালোভাবে না দেখেই মার্ক করে দিয়েছেন তখন ওই শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধা কমে যায়। আর এখানেই শিক্ষকের কর্তব্যের অবহেলা প্রকাশ পায়। অতএব একজন শিক্ষককে অবশ্যই তার দায়িত্বের প্রতি কর্তব্য পরায়ণ হতে হবে।

শিক্ষক সম্পর্কে আরো ভালোভাবে বুঝাতে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িনি কিন্তু হোটেল এন্ড ট্যুরিজম বিভাগের শিক্ষক ড. সন্তোষ সহ আমার তিন চারজন ছাত্র ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াছেন। আমার সেই শিক্ষক ছাত্রটি যখন পা ছুঁয়ে সালাম করে আমার কাছ থেকে দোয়া নেয় তখন এর চেয়ে আনন্দের ব্যাপার আর কী হতে পারে? একজন শিক্ষক যদি একটা শিক্ষার্থীকে মানুষ বানাতে পারে তবেই তিনি সফল।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি সত্যিকার অর্থে “মানুষ” খুঁজছি। কিন্তু আমি এখনও পাইনি। দীর্ঘ সময় ধরে আমি দেখেছি যে তিনি (উদাহরণ স্বরূপ যে কেউ) মনে হয় একজন সত্যিকারের মানুষ, মনে হয় তিনি সমাজের জন্য অনেক ভালো কাজ করছেন। কিন্তু তার রাত্রটা সুন্দর নয়। রাতে তিনি মদ্যপান করেন, কিংবা জুয়া খেলেন অথবা অশ্লীল কোনো কাজে লিপ্ত থাকেন, হয়তোবা দেখা যায় নারীরা তার কাছে নিরাপদ নয়, তার নারী প্রীতির স্বভাব আছে। আবার দেখা তার সবকিছুই ভালো কিন্তু মা-বাবাকে শ্রদ্ধা করেন না, মা-বাবাকে রেখেছেন বৃদ্ধাশ্রমে। আবার দেখা যায় যে তিনি অনেক ভালো মানুষ আমি তাকে অনেক শ্রদ্ধাও করি, কিন্তু তিনি সুদের ব্যবসায় জড়িত।

এমন হাজারো উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আমি সারা জীবনেও খুঁজে পাইনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। আসুন আমরা সবাই মিলে একজন ভালো মানুষ বানাই। যদি আপনারা কখনো একজন ভালো মানুষের সন্ধান পান তাহলে আমাকে বলবেন। আমি তার চেহারার সাথে আমার চেহারা মিলিয়ে দেখবো আমার সাথে কতোটা মিল আছে। যদি তাঁর চেহারার সাথে আমার চেহারার মিল খুঁজে পাই তখন বুঝবো আমিও মানুষ হয়েছি। আমি যদি আয়নার সামনে দাঁড়াই শুধু আমার প্রতিবিম্ব দেখতে পাই রিয়েল চিত্রটা দেখতে পাই না। অতএব আমরা সবাই মিলে আসুন পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টি করি। একজন মানুষ যদি সৃষ্টি হয় তাহলে আমি আপনি তার সাথে মিলিয়ে মানবতা কী জিনিস, মানুষের গুণ কী জিনিস তাহলে আমরা এগুলো মানুষের প্র্যাকক্টিসে পাবো। আসুন আমরা সবাই যেনো এই কাজটাই অনুসরণ করি।

তিনি আরো বলেন, একজন সুশিক্ষার্থীই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আসুন আমরা তাদেরকে পিতামাতাকে শ্রদ্ধা করতে শিখাই। মানুষ হতে গেলে প্রথমেই তাকে মা চিনতে হবে। একটা মা যখন সন্তানকে পেটে নেয় তখন সেই সময় দশমাস কী পরিমাণ কষ্ট করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাথাব্যথা, জ্বর, ঠাণ্ডা-কাশি এমন অসংখ্য সমস্যায় ভুগেন তবুও রোগমুক্তির জন্য কোনো ঔষধ সেবন করেন না। কেননা যদি তার পেটের সন্তানের কোনো ক্ষতি হয় এইভেবে। তাই কোনো মানুষ অন্যায় করতে গেলে যখন চোখের সামনে তার মায়ের চেহারাটা ভাসায় তখন কোনো মানুষই অন্যায় করতে পারে না।

এক্ষেত্রে মায়েদের প্রতি বিনীত অনুরোধ রেখে তিনি বলেন, আপনারা আপনাদের সন্তানকে আদর, সোহাগ ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মতো মানুষ বানান। যেনো সে কোনো ভুল করার আগে আপনার চেহারা দেখতে পায়। ঠিক এমনিভাবেই সকলের প্রচেষ্টায় প্রতিটি পাড়া মহল্লায় এমনকি গোটা বাংলাদেশে একদিন অনেকগুলো ভালো মানুষের সৃষ্টি হবে। যারা দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করবে এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে — এটাই আমার প্রত্যাশা।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর