• অর্থনীতি শীর্ষ সংবাদ
  • যৌক্তিক কারণ ছাড়া, প্রতীকী মূল্যে বা বিনামূল্যে সরকারের খাসজমি বরাদ্দ নিতে পারবেনা কেউ

যৌক্তিক কারণ ছাড়া, প্রতীকী মূল্যে বা বিনামূল্যে সরকারের খাসজমি বরাদ্দ নিতে পারবেনা কেউ

প্রকাশিত: ৫:৩২ অপরাহ্ণ , ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 years আগে

কালের বিবর্তন ডেস্ক : সরকারের খাসজমি নিয়ে কাড়াকাড়ি বন্ধ করতে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি জরুরি পরিপত্র জারি করেছে। এতে করে ইচ্ছে করলেই যে কেউ যৌক্তিক কারণ ছাড়া, প্রতীকী মূল্যে বা বিনামূল্যে সরকারের খাসজমি আর বরাদ্দ নিতে পারবেনা কেউ।

সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা জানান, প্রতীকী মূল্যে অকৃষি খাসজমি বরাদ্দের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদনের স্তূপ জমেছে। এই খাসজমি নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি চলছে। নামমাত্র মূল্যে এসব জমি বরাদ্দ দিতে হয় ভূমি মন্ত্রণালয়কে। বহু খাসজমি বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে অনেকেই। তা নিয়ে মামলা চলছে। টাকার অভাবে ভূমি মন্ত্রণালয় সেসব মামলাও ভালো করে লড়তে পারে না।

এমতাবস্থায় ভূমি মন্ত্রণালয় গত ১৯ নভেম্বর একটি পরিপত্র জারি করে বলেছে, যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রতীকী মূল্যে কাউকে অকৃষি খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া হবে না। খাসজমি হলেও বাজারমূল্যে তা কিনে নিতে হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর এমন পরিপত্র জারি করা হয় বলে জানা গেছে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ২০২৪ সালেই উচ্চ মধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি পাচ্ছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। ফলে এখানে জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার অতি জরুরি। বিশেষ করে দুই ফসলি ও তিন ফসলি জমি দেশের অমূল্য সম্পদ। এটা রক্ষা করতেই হবে। পাশাপাশি অন্যান্য জমিও যথাযথ ব্যবহার করতে সরকার নীতিগতভাবে একমত। ফলে ওই পরিপত্র জারি করে তা সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পাঠানো হয়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সারাদেশে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল করা হচ্ছে। যে কোনো ধরনের শিল্পকারখানা সেখানে করতে হবে। যেখানে-সেখানে কারখানা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা যাবে না। ওই সব শিল্পকারখানায় বিশেষ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ অন্যান্য সামগ্রিক সহযোগিতা দেওয়া হবে। বর্তমানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিল্পও ওই সব প্রস্তাবিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করা হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কৃষি-অকৃষি জমি ব্যবহারেও সরকার নতুন নীতিমালা করছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে বিশেষ করে ভূমি, রেলসহ সরকারের হাতে যেসব খাসজমি আছে, তার সদ্ব্যবহার করতে হবে। পরিপত্রে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া বা যেনতেন কারণে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আওতাধীন দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থা প্রতীকী মূল্যে খাসজমি বরাদ্দ পেতে আবেদন করছে। বেসরকারি সংস্থাও এ রকম আবেদন করছে। এই আবেদনের পরিমাণ সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বাড়ছে। খাসজমি পাওয়ার আশায় প্রকল্পের অনুকূলে জমি ক্রয়, অধিগ্রহণ, বন্দোবস্তের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ কখনও কখনও রাখছে না সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়। বহু সংস্থা এ রকম খাসজমি বরাদ্দ নিয়ে ফেলে রেখেছে। যে প্রকল্পের কথা বলে নিয়েছিল, সেটা করা হয়নি। এসব জমি থেকে আর্থিক কোনো উপযোগিতা সরকার বা জনগণ পাচ্ছে না।

জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা, ১৯৯৫-এর ১০.০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যতিক্রম হিসেবে শুধু সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতীকী মূল্যে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত অনুমোদন দিতে পারে। সুকৌশলে কোনো কোনো বিভাগ ও মন্ত্রণালয় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিশেষ বিবেচনায় এসব জমি বরাদ্দ নিয়ে নিচ্ছে। এতে করে ভূমি মন্ত্রণালয় যথাযথ অর্থ পাচ্ছে না। ফলে মন্ত্রণালয়ের আয় কমে যাচ্ছে। অথচ ভূমি বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমূল্য সম্পদ হলেও বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে প্রতীকী মূল্যে।

কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জমি নিয়ে শত শত মামলা চলছে। মন্ত্রণালয়ের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ না থাকার কারণে সেসব মামলায় লড়া করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য অধিকাংশ মামলায় পিছিয়ে পড়তে হয়। খাসজমি বরাদ্দের জন্য যদি একটা বাজারমূল্য বরাদ্দ থাকত তাহলে অনেক আয় হতো। ভূমি মন্ত্রণালয় সেখান থেকে মামলা পরিচালনা করতে পারত।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরও বলছেন, রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয় সরকারি খাসজমি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন, অবৈধ উচ্ছেদ দখল থেকে উদ্ধারে আইনগত পদক্ষেপ নেবে। এসব সম্পত্তির উন্নয়ন, সংরক্ষণ এবং সংশ্নিষ্ট আদালতে আইনগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। সেই পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ মন্ত্রণালয়ের নেই। সরকার এ বিষয়ে অবহিত। তার পরও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পগুলোর অনুকূলে প্রতীকী মূল্যে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দিতে হচ্ছে প্রতীকী মূল্যে। অর্থাৎ, এক প্রকার বিনামূল্যে। অথচ এসব প্রকল্পে প্রতিটি খাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্যয় বরাদ্দ থাকছে। কিন্তু বিনামূল্যে জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে। অর্থ ছাড়াই যেহেতু জমি পাওয়া যায়, এজন্য সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতীকী মূল্যে বন্দোবস্ত পেতে আবেদনের সংখ্যা বেড়ে চলেছে বলে কর্মকর্তারা জানান। কর্মকর্তারা আরও জানান, বিনামূল্যে বরাদ্দের বিষয়টি আগেও ছিল। তবে এখন বাড়ার পেছনে মূল কারণ উন্নয়ন কার্যক্রম অনেক বেড়েছে দেশব্যাপী। সারাদেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে। শিক্ষিত বেকারের অভাব নেই। ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা ইত্যাদি করার চেষ্টা করছে অনেকেই। ফলে জমির প্রয়োজন আগের তুলনায় বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, যদিও অকৃষি খাস ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা ১৯৯৫-এ প্রতীকী মূল্যে বা বিনামূল্যে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদানের কোনো বিধান নেই। তবে ওই নীতিমালার একটি অনুচ্ছেদে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজন মনে হলে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অকৃষি খাসজমি বিনামূল্যে বা প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ নিতে পারবে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এই সুযোগ নিচ্ছে।

সম্প্রতি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া খাসজমি বরাদ্দের আবেদন বৃদ্ধির বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে এসেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের জন্য বিশেষ বিবেচনায় প্রতীকী মূল্যে বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুশাসন দিয়ে বলেছেন, ‘হর্টিকালচার নির্মাণ প্রকল্পে কি জমির মূল্য বাবদ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি? প্রতীকী মূল্যে কেন দিতে হবে?’ খোদ সরকারপ্রধান এমন প্রশ্ন করলে ভূমি মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন যথাযথ অনুসরণের জন্য সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এই পরিপত্র জারি করা হয়।

ভূমি সচিব মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রে আরও বলা হয়, অকৃষি খাসজমির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্নিষ্ট সব মন্ত্রণালয়-বিভাগ এবং তাদের অধীনস্থ অধিদপ্তর, দপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থার বিভিন্ন প্রকল্প এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আবেদনের ক্ষেত্রে জারি করা পরিপত্রটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় ডিপিপিতে যে কোনো শ্রেণির জমির বন্দোবস্ত/অধিগ্রহণ ক্রয় হস্তান্তর প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের যৌক্তিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতীকী মূল্যে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদানের ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অন্যান্য সব ক্ষেত্রে জমির বাজারমূল্য অনুযায়ী সালামি পরিশোধ সাপেক্ষে বন্দোবস্ত প্রদান করা হবে। কোনো ক্ষেত্রে প্রতীকী মূল্যে অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদানের আবশ্যকতা একান্তভাবে অপরিহার্য হলে যৌক্তিক কারণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

কৃষি বা অকৃষি নির্বিশেষ জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রকল্পের লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী জমির নূ্যনতম চাহিদা নিরূপণ করতে হবে। প্রয়োজনে বহুতল ভবন নির্মাণ করে জমির ব্যবহার সাশ্রয় করতে হবে। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৃথক পৃথক ভবনের পরিবর্তে সরকারি সংস্থার অফিসের জন্য একই স্থানে পরিকল্পিতভাবে সমন্বিত বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

পরিপত্রে আরও বলা হয়, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও স্থাপত্য নকশার মাধ্যমে জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। দুই এবং তিন ফসলি কৃষিজমি সুরক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। অধিগ্রহণ বা বন্দোবস্ত প্রদানের ক্ষেত্রে এসব শ্রেণির জমি আওতামুক্ত করতে নিরুৎসাহিত করতে হবে। জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং প্রত্যাশী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে সমন্বিতভাবে সরেজমিন প্রস্তাবিত এলাকা পরিদর্শন করতে হবে। জমির চাহিদা নূ্যনতম সরেজমিন প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকতে হবে। বন্দোবস্তকৃত জমি অপব্যবহূত থাকলে বা যথাযথভাবে ব্যবহার না হলে ক্ষতিপূরণ ছাড়া পুনঃগ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর