• লিড নিউজ সারাদেশ
  • মুরাদনগরে ৪শ বছরের প্রাচীন মন্দিরের মামলার রায় সেবায়েতের পক্ষে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

মুরাদনগরে ৪শ বছরের প্রাচীন মন্দিরের মামলার রায় সেবায়েতের পক্ষে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

প্রকাশিত: ৩:০২ অপরাহ্ণ , ২১ মার্চ ২০২০, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 years আগে

মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধিঃ
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ৪শ বছরের প্রাচীন শ্রীকাইল বরদেশ্বরী কালি মন্দির সংক্রান্ত কুমিল্লা যুগ্ম জেলা জজ আদালতের একটি রায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ প্রদান করেছেন। মন্দিরের প্রয়াত সেবায়েত হরিপদ চক্রবর্তীর ছেলে পবিত্র
কুমার চক্রবর্তীর আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৯/০৩/২০২০ ইং (আপিল নং ৩৩৫/২০১৯) বিচারপতি মামুন রহমান এবং বিচারপতি খিজির হায়াৎ যৌথ বেঞ্চ এ স্থগিতাদেশ প্রদান করেন। ২০১৩ সালে শ্রীকাইল গ্রামের জীতেন্দ্র মল্লিক গং বাদী হয়ে বরদেশ্বরী মন্দিরের প্রয়াত সেবায়েত হরিপদ চক্রবর্তীর ছেলে পবিত্র কুমার চক্রবর্তীদের নামে দেওয়ানী মোকাদ্দমা নং ২৯/১৩ দায়ের করেন । এই মামলার রায় গত ১২/০৩/২০১৯ কুমিল্লা জেলা যুগ্ম জজ ২য় আদালতের বিচারক সেলিনা আক্তার রায় প্রদান করেন। রায়ে উল্লেখ রয়েছে যে, বাদীপক্ষ মন্দিরটি কমিটি দ্বারা পরিচালনা করে তা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। এলাকার লোক দ্বারা কমিটি করে মন্দির পরিচালিত হয়েছে তার কোন অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি এবং হরিপদ চক্রবর্তীর পরিবার যুগযুগ ধরে মন্দিরের সেবায়েত ও পরিচালনা করে আসছে তা প্রমাণিত হয়েছে বলে পবিত্র কুমার চক্রবর্তী দাবি করেন।

মামলার রায়ে আরো দেখা যায় যে, এসএ খতিয়ানে হরিপদ চক্রবর্তীর নামে রেকর্ডকৃত ২ একর ৪৭ শতক ভূমি এবং মন্দিরের নামে বিএস খতিয়ানে ৯ শতক জায়গাসহ মোট ২.৫৬ একর ভূমি শ্রী শ্রী বরদেশ্বরী কালী মন্দিরের নামে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।

এই রায়ে বিবাদীগণ পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে না পেরে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে আপিল করেন এবং রায় স্থগিতের জন্য আবেদেন (আপিল নং ৩৩৫/২০১৯) করেন পবিত্র কুমার চক্রবর্তী। গত ৯/০৩/২০২০ ইং হাইকোর্ট ডিভিশনের মাননীয় বিচারপতি মামুন রহমান ও বিচারপতি খিজির হায়াৎ সমন্বয়ের যৌথ বেঞ্চ কুমিল্লা যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালতের (মামলা নং ২৯/২০১৩) রায় ১২/০৩/২০১৯ ইং প্রদত্ত রায়টির উপর স্থগিতাদেশ প্রদান করেন।

উল্লেখ্য, গত ৯ মার্চ ২০২০ ইং হাইকোর্টে স্থগিতাদেশ প্রদানের দিন দুপুরে শ্রীকাইল গ্রামের বিশ্বজিৎ সরকার বিষুর সভাপতিত্বে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় মন্দির পুনঃনির্মাণ উপলক্ষে নামফলক উদ্বোধন করা হয়।

এ বিষয়ে পবিত্র কুমার চক্রবর্তীর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন: হিন্দু সম্প্রদায়ের যে অংশটি ২০১১ সালে মামলা দায়ের করে তাদের তথাকথিত কমিটি দ্বারা মন্দির পরিচালিত করেন তা প্রমাণ করতে না পেরে এবং হাইকোর্টে আপিল চলা অবস্থায় এবং স্থগিতাদেশ জারির পরেও সম্মানীত অতিথিদের ভুল তথ্য বুঝিয়ে তরিঘরি করে আয়োজন করেন। ইতোমধ্যে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ কপি প্রশাসনের যথাযথ অফিসে প্রেরন করা হয়েছে । শ্রীকাইল বরদেশ্বরী কালী বিগ্রহ আমাদের বংশানুক্রমিক কুল দেবতা এবং আমরা ১৫তম প্রজন্ম যাহা শুরু থেকেই পূজা অর্চনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছি সম্পূর্ণ আমাদের পারিবারিক নিজ ব্যয়ে। মন্দিরটি একটি প্রাইভেট দেবোত্তর মন্দির বলে দাবি করেন পবিত্র কুমার চক্রবর্তী।

মামলার বিবাদী ও তাদের পূর্বপুরুষদের নামে ইস্যুকৃত সিএস খতিয়ান নং ২১৪৫ পর্যালোচনা করে জানা যায়, ১০২৩ সালে আনুমানিক ৪০৪ বছর পূর্বে তৎকালিন নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ বাহাদুর শ্রীকাইল গ্রামের কতিপয় ব্রাহ্মণগণকে শ্রী শ্রী বরদেশ্বরী কালী মাতার পূজা অর্চনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য কিছু ভূমি দান করেন। উক্ত ভূমির ব্যবহার করে ব্রাহ্মণগণ মন্দিরে পুজা অর্চনা , রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করে আসছেন। ব্রিটিশ আমলে নবাবের দানকৃত ভূমি থেকে ৯ শতক ভূমি বরদেশ্বরী মন্দিরের নামে সিএস খতিয়াতে লিপিবদ্ধ হয়। অবশিষ্ট সম্পত্তি (বাড়ী, জমি, পুকুর, ডোবা, নাল) একাধিক ব্রাহ্মণ সেবায়েতদের নামে হিস্যা অনুযায়ী রেকর্ড হয়।

পরবর্তীতে পাকিস্তান শাসন আমলে মন্দিরের নামের ৯ শতক জায়গা সরকারি সম্পত্তি ‘খাস’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। পরে বিএস খতিয়ানে ১০৩২ দাগে ৯ শতক জায়গা বরদেশ্বরী কালী দেবীর পক্ষে সেবায়েত হরিপদ চক্রবর্তীর নামে রেকর্ড হয়। বাকি সম্পত্তি সেবায়েত হরিপদ চক্রবর্তীর নামে এস.এ খতিয়ানে রেকর্ড হয়। এস.এ খতিয়ানের ধারাবাহিকতায় বিএস খতিয়ানে ও হরিপদ চক্রবর্তীর নামে রেকর্ড হয়।

২০১০ সালে ধর্ম মন্ত্রনালয়ের অধীনে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টে তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করে প্রয়াত সেবায়েত হরিপদ চক্রবর্তীর ছেলে পবিত্র কুমার চক্রবর্তী। দায়িত্বরত সচি্বের স্বাক্ষরিত তালিকা ভুক্তি সনদ পত্র (কুমিল্লা-৮৫) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

পবিত্র কুমার চক্রবর্তী আরো জানান, ২০১১ সালে মন্দিরটি সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু করতে চেয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা মন্দির ভবনের নকশাও প্রস্তুুত করা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একটি স্বার্থানেষী মহল ৪শ বছরের প্রাচীন এই মন্দির দখল নিতে আমার কাজে বাধা প্রদান করে এবং আমার উপর হামলাও করা হয়। গ্রামের প্রভাবশালী এক রাজনীতিক নেতার ইন্ধনে জীতেন্দ্র মল্লিক ও সজল করকে বাদী করে আমাদের পরিবারসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে দেওয়ানী মোকাদ্দমা (১০২/১১) দায়ের এবং পিআর (১০৮৯/১১) মামলা দায়ের করে। উক্ত পিআর মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বাদীগন মন্দিরের সেবায়েত বা পুজা অর্চনা করেছেন তা প্রমানিত হয়নি বলে মামলাটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর খারিজ হয়ে যায়। আমাদের পরিবার দ্বারাই যে বংশানুক্রমিক ভাবে মন্দিরের সেবাপুজা পরিচালনা করে রক্ষণা বেক্ষন করা হয়ে আসছে তা তখনও প্রশাসন কর্তৃক প্রমানিত হয়।

হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের ফলে মন্দির পুনঃনির্মাণ সম্পর্কে সমস্যা হবে কিনা জানতে চাইলে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অভিষেক দাশ বলেন, বিবাদী কর্তৃক হাইকোর্টের ৬ মাসের স্থগিতাদেশের উকিল প্রেরিত কপি পেয়েছি, তবে মাননীয় বিচারকগণের স্বাক্ষরিত পূর্ণাঙ্গ আদেশের কপি এখনো পায়নি।
মামলার বাদী জীতেন্দ্র মল্লিক কিছুদিন আগে মৃত্যুবরণ করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।