মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি কসবা

প্রকাশিত: ১১:০৮ অপরাহ্ণ , ২৬ মার্চ ২০২১, শুক্রবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 months আগে
কুল্লাপাথর, কসবা
কসবা কুল্লাপাথর থেকে ফিরে এসে মোবারক হোসেন চৌধুরী নাসির ২২শে মার্চ ২০২১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পূর্ব প্রান্তে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল নগর থানার পশ্চিমে সীমান্তবর্তী কসবা উপজেলা। এই উপজেলায়, সালদা, বিজনা, তিতাস, সিনায়, বুড়ি সাঙ্গুর কালিয়ারা নদী এঁকেবেঁকে কসবার মধ্য অতিক্রম করে গেছে। উপজেলার পূর্ব প্রান্তে রয়েছে লালমাটির পাহাড়ি টিলা ভূমি ছোট ছোট টিলার সবুজ বনানী আর পশ্চিম প্রান্তে সমতল ভূমির সৌন্দর্যের এক ঐতিহ্যবাহী স্থান কসবা। সবুজ গাছ পালার গ্রাম পাহাড়ি টিলার সবুজ বনানীর কসবা প্রকৃতির মাঝে মহান মুক্তিযুদ্ধের সমাধিস্থান। যা মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হাজার বছরের ঐতিহ্য লালিত আন্দোলন- প্রিয় সংগ্রামী বাঙালি জাতির সময়ের সাহসী সন্তান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। আমাদের কসবা আখাউড়া মাটি ও মানুষের অহংকার এডভোকেট সিরাজুল হক বাচ্চু মিয়া সাহেব, বঙ্গ বন্ধুর পাশে থেকে আওয়ামী লীগকে দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গ বন্ধুর সোনার বাংলা করার দৃঢ় প্রত্যয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে তার ভূমিকা জাতি আজ ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। কসবা অর্থ ছোট শহর, বা উপশহর। এক সময় এখানে ত্রিপুরার অস্থায়ী রাজধানী ছিল। সাহিত্য, সংস্কৃতি শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের তীর্থভূমি এই কসবা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এক গৌরব উজ্জল ঐতিহ্য দেশে-বিদেশে সকলের কাছে সর্বাধিক পরিচিতি । মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কসবা থানা বহু ছাত্র কৃষক-শ্রমিক সরকারি কর্মচারী অংশগ্রহণ করেন। এ থানায় প্রায় ৪৭ জন মুক্তিযুদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যদিকে আহত হন ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা।

কসবা থানায় পাক সেনাদের সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে দেশের বহু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। কোল্লাপাথর, আকুবপুর, শ্যামপুর, পুটিয়া, চারগাছ, শিমরাইল, ইত্যাদি স্থানে ছোট-বড় আটটি স্থানে সমাধিস্থল রয়েছে। এর মধ্যে কোল্লাপাথর সমাধিস্থলই বৃহৎ। এখানে ৪৯ জনের নাম ফলকে লেখা থাকলেও অনেকে সমাধিস্থ করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান। অপরদিকে লক্ষ্মীপুর সমাধিস্থলে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা কে সমাধিস্থ করা হয়। কোল্লাপাথর সমাধিস্থলে : অবস্থান কসবা থানা বায়েক। ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত ঘেসা একটি গ্রাম কুল্লাপাথর। সীমান্তবর্তী রেলস্টেশন সালদা নদী থেকে পূর্বদিকে প্রায় ২/৩ কিলোমিটার বালুকাময় রাস্তা পাহাড় ও টিলার গাঁ ঘেসে কোল্লাপাথর সমাধিস্থলে গিয়ে লেগেছে। উঁচু-নিচু পাহাড় ও টিলা ইদানিং বেষ্টিত পিচ রাস্তা ও ছায়া সুনিবিড় কোল্লাপাথর গ্রাম। এ গ্রামেই ঘুমিয়ে আছে বাঙালি জাতির অহংকার অনেক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

ইতিহাস : এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করে, সেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দশম সেক্টরটি প্রধান সেনাপতির অধীনস্থ করা হয়। নৌ-কমান্ড ওসি এন্ড সি স্পেশাল বাহিনী এই সেক্টরে যুদ্ধ তৎপরতা পরিচালনা করে। ২১ নম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর। ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এর মধ্যে কসবায় মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ২ নং সেক্টর আওতাভুক্ত ছিল। ২ নং সেক্টর অধিনায়ক খালেদ মোশারফ,ছিলেন কোল্লাপাথর, খাদলা, মাদলা, বেলতলী সহ বহুগ্রাম ছিল মুক্তাঞ্চল। মুক্তিযুদ্ধাদের অবাধ বিচরণ ছিল এ সমস্ত গ্রাম সমূহে। খালেদ মোশাররফের একান্ত ইচ্ছা ছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একটি পৃথক সমাধিস্থল গড়ে তোলা। সালদা নদী সাব সেক্টরে তখন তুমুল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন হাবিলদার তইয়ব আলী। যুদ্ধ শেষে সাব সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন ক্যাপ্টেন আব্দুল গাফফার সহ যুদ্ধার মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ছিলেন। সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা করিমের পিতা মরহুম আব্দুল মান্নান দান করলেন ৬৫ শতক ভূখন্ড। যুদ্ধে বহু শহীদ কে এখানে সমাধিস্থল করা হয়। এভাবেই গড়ে ওঠে বাংলার মুক্তি সংগ্রামের অমূল্য স্মৃতি কোল্লাপাথর সমাধিস্থল। কসবায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বীর উত্তম খেতাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত ৬ জন রয়েছে। এখানে যাদেরকে সমাধিস্থল করা হয় সেই সকল বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন।

১.সিপাহী দর্শন আলী
২. মোঃ জাকির হোসেন
৩.আব্দুল জব্বার
৪. হাবিলদার তইয়ব আলী
৫. নায়েক আব্দুস ছাত্তার ৬.সিপাহী আব্বাস আলী
৭.মোঃ ফারুক আহমেদ ৮.মোহাম্মদ ফখরুল আলম
৯. মোজাহদী নুর মিয়া
১০. নায়েক মোজাম্মেল হক
১১. নায়েক সুবেদার মোঃ আব্দুস সালাম
১২. নোয়াব আলী
১৩. সিপাহী মুসলিম মৃধা
১৪. প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম
১৫. মোহাম্মদ আবদুল ওদুদ
১৬. সিপাহী আজিম উদ্দিন
১৭. মতিউর রহমান
১৮. মোশারফ হোসেন
১৯. নায়েব সুবেদার মাইনুল ইসলাম
২০. সিপাহী নুরুল হক
২১. মোঃ আব্দুল কাইয়ুম
২২. সিপাহী হুমায়ুন কবির
২৩. ল্যান্স নায়েক মোঃ আব্দুল খালেক
২৪. ল্যান্স নায়েক আজিজুর রহমান
২৫. মোহাম্মদ তারু মিয়া
২৬. নায়েক সুবেদার বেলায়েত হোসেন
২৭. মোঃ রফিকুল ইসলাম
২৮. মোঃ মোরশেদ মিয়া
২৯. শ্রী আশুতোষ রঞ্জন দে
৩০. মোঃ তাজুল ইসলাম
৩১. মোঃ শওকত
৩২. মোঃ আব্দুস সালাম সরকার
৩৩. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর
৩৪. আমির হোসেন
৩৫. শ্রী পরেশ চন্দ্র মল্লিক
৩৬. মোঃ জামাল উদ্দিন
৩৭. মোঃ আব্দুল আউয়াল
৩৮. মোঃ আবেদ আহমেদ
৩৯. মোঃ সিরাজুল ইসলাম
৪০. মোঃ আব্দুর রশিদ
৪১. মোঃ মতিউর
৪২. মোঃ শাকিব মিয়া
৪৩. মোহাম্মদ আবদুর রশিদ
৪৪. আনছার এলাহী বক্স
৪৫. সিপাহী শহীদুল হক
৪৬. সিপাহী আনোয়ার হোসেন
৪৭. মোঃ আব্দুল বারী
৪৮. অজ্ঞাত ও
৪৯. অজ্ঞাত

লক্ষ্মীপুর শহীদ সমাধিস্থল:
কোল্লাপাথরের পরেই এই থানায় যে সমাধি ক্ষেত্রটি পরিচিত পেয়েছে সেটি হল লক্ষ্মীপুর শহীদ সমাধিস্থল। মাত্র ১২ জন বীর শহীদের কবর এখানে। কসবা থানা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সীমান্তের পাশের এক প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে এই সমাধিস্থল। অত্যন্ত বড় মাপের সমর নায়ক ২ নম্বর সেক্টরের প্রধান খালেদ মুশাররফের নির্দেশে এই সমাধি ক্ষেত্রটি গড়ে ওঠে। তৎকালীন সাব সেক্টর কমান্ডার আইনুদ্দিন গ্রুপ কমান্ডর নাজির হোসেনের নেতৃত্বে লতুয়া মুরা, চন্ডিদ্বার ,কসবা ,বগাবাড়ি আকুবপুর ইত্যাদি এর মধ্যে বগাবাড়ির আব্দুল ওহাব মিয়ার বাড়িতে মুক্তিবাহিনী ব্যাংকার করে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে বলে জানা যায়। এ সমস্ত এলাকায় সম্মুখ সমরে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদেরকে এখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছে। এ সমাধিস্থলে সমাধিস্থ আছেন।

১. লেফটেন্যান্ট আজিজুল হক
২. সুবেদার আবুল হোসেন
৩. হাবিলদার আব্দুল হাকিম
৪. হাবিলদার আবুল কাশেম
৫. নায়েক আবুল কালেম
৬. ল্যান্সনায়েক নুরুল হক
৭. সিপাহী আবেদ আলী
৮. সিপাহী এনামুল হক
৯. সিপাহী আবুল কাশেম
১০. সিপাহী বুরহান উদ্দিন
১১. সিপাহী রফিকুল ইসলাম
১২. সিপাহী আব্দুর রাজ্জাক।

সকল শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে খন্ড খন্ড শহীদ মুক্তিযুদ্ধাদের কবর যেখানে রয়েছে সকল কবর একত্রিত করে কোল্লাপাথর শহীদ সমাধিস্থলে স্থানান্তর করার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী ।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধাদের কল্যাণের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালনে জাতি আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে ।তাই এই শহীদদের স্মৃতিকে আরো স্মৃতিময় করার জন্য কসবা উপজেলাবাসীর প্রাণের দাবি।

লেখক সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও কলামিস্ট

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর