একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি

প্রকাশিত: ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ , ২৩ মে ২০২০, শনিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 2 months আগে
গত ০৩/০৫/২০২০ ইং তারিখ রাতে তারাবী নামাজ পড়ছিলাম, এমতাবস্থায় আমার মুঠোফোনে পরপর কয়েকটি কল আসছিল। আমি নামাজ শেষ করে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমার এক বন্ধুর কল অনেক গুলো কল দেখে আমিও সাথে সাথেই তাকে কল ব্যাক করে জিজ্ঞেস করলাম কিরে? এতো কল দিচ্ছিস কেন? কোন সমস্যা? উত্তরে বন্ধুটি খুব করুন স্বরে বললো হ্যাঁ বন্ধু আমার আম্মা খুবি অসুস্থ।
আগামীকাল সকালে ঢাকা নিয়ে আসবো তুই যেকোন একটা  হাসপাতালে কথা বলে সবকিছু ব্যবস্থা করে রাখিস। যেহেতু আমি অনেকদিন ধরে ঢাকায় থাকি, সেহেতু বন্ধু হিসেবে আমার কাছে এটুকু চাওয়া থাকতে-ই পারে। যাক আমি তাকে আস্বস্ত করে বললাম ঠিক আছে সকালে চলে আয়।
এই বলে আমি আমার এক ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করলাম, তাকে বললাম যে কালকে সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমার এক বন্ধু তার অসুস্থ মা’কে নিয়ে ঢাকায় আসবে ওনার অবস্থা বেশি একটা ভালো না তুই যেকোনো একটা হাসপাতালে ভর্তির ব্যাবস্থা করে দিতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য আমার সেই ডাক্তার বন্ধুটি আমাকে আস্বস্ত করতে পারেনি। যার ফলে আমিও একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। তারপরও আমি আমার বন্ধুর কাছে একটু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বললাম ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে তুই তোর মা’কে নিয়ে সকালে চলে আয়।
পরদিন সেহরি খেয়ে আমি আর ঘুমাইনি, কারণ আমার বন্ধু আমাকে ওয়াদা করিয়েছে আমি যেনো ওর প্রথম কল-ই রিসিভ করি, তাই সেহরির পর না ঘুমিয়ে বন্ধুর ফোনের অপেক্ষায় বসে আছি, কখন বন্ধু ফোন করে বলবে যে আমি ঢাকায় ঢুকছি তুই কোথায়? এভাবে সকাল ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি নিজে-ই বন্ধুকে কল করে জিজ্ঞেস করলাম কিরে কোথায়? সে বললো এইতো বন্ধু কিছু সময়ের মধ্যে ঢাকায় ঢুকবো। আমিও রেডি হলাম এর মধ্যে সব লিংকে ফোনে যোগাযোগ করতে শুরু করলাম, কারণ গত ০২/০৫/২০ ইং তারিখে এক ছোট ভাইয়ের ফেইসবুক ওয়ালে একজন ডাক্তার হয়েও রোগীকে বাচাতে না পারার আর্তচিৎকার ও করুন কাহিনী পড়ে আমার গা শিহরিত হয়েছিল।
আর এসব যদি আমার বন্ধু শুনে যে কোনো হাসপাতালে রোগী ভর্তি নিবে না, তাহলে সে নিরাশ হবে, কষ্ট পাবে।
তাই ভেবে আমি আমার সকল লিংকে যোগাযোগ করে যাচ্ছি, বিভিন্ন লিংকে যোগাযোগ করে যখন কোনো কিনারা পাচ্ছিলাম না, ঠিক তখন-ই আমার এক চাচার মাধ্যমে ধানমন্ডি একটি হাসপাতালে ভর্তির আশ্বাস পেলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আস্বস্ত করে বললো তাড়াতাড়ি রোগী নিয়ে আসেন। খবরটা শুনে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বন্ধুকে কল করে হাসপাতালের এড্রেসটা দিয়ে বললাম তুই এম্বুলেন্স নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আয়।
এবার আমি আর দেরি না করে সাথে সাথে বাসা থেকে বের হয়ে ঐ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম এবং যেতে-যেতে আমার অন্যান্য বন্ধুদেরকে কল করে বললাম ওরা যেনো ওদের যার যার লিংকে কথা বলে বিকল্প ব্যাবস্থা করে রাখে। ততক্ষণে আমি ধানমন্ডি ঐ হাসপাতালে পৌঁছে ইমারজেন্সির সামনে গিয়ে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করলাম, আমি পৌঁছার প্রায় ৪০ মিনিট পর আমার বন্ধু এম্বুলেন্সে করে তার মা’কে নিয়ে এসে হাজির হয়েছে। এবার শুরু হলো হাসপাতালে দ্বায়িত্বরত ডাক্তার এবং কর্তৃপক্ষের প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া রোগী কোথায় থেকে এসেছে? এখানে কোন ডাক্তার রেফার করেছে? রোগীর জ্বর ঠান্ডা কাশি আছে না-কি? করোনার টেস্ট করা হয়েছে কি-না?
আমি বললাম আপনাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছে, তাছাড়া উনি তো করোনায় আক্রান্ত না, ওনার হার্টের সমস্যা আপনারা আগে রোগীকে ভিতরে নিয়ে দেখেন সমস্যা গুলো কি? তারপর যে সিদ্ধান্ত নিবেন আমরা মেনে নেবো। তখন ওরা রোগী নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ইমারজেন্সিতে ঢুকালেন, সেখানে কর্তব্যরত যেই ডাক্তার আছে উনি আবার বিভিন্ন প্রশ্ন শুরু করলেন, এবং পুরনো প্রেসক্রিপশন গুলো দেখে স্বভাবজাত আচরণ করে বললেন, পুরনো সব টেস্ট বাদ দিয়ে নতুন করে টেস্ট করাতে হবে।
আমার বন্ধু বললো ডাক্তার সাহেব যেই যেই পরীক্ষা করার দরকার সব করেন, তবুও আমার মা’কে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেন। এবার ডাক্তার সাহেবের অনুমতি সাপেক্ষে বয় এবং নার্সরা তাদের কার্যক্রম শুরু করলেন এবং যেই যেই টেস্ট করার সব করলেন, তারপর বলা হলো একজন অধ্যাপক কে দেখাতে হবে তাও দেখানো হলো, উনিও এই হাসপাতালে-ই বসেন।
কিন্তু ডাক্তার সাহেব রোগীর সবকিছু দেখে অপারগতা প্রকাশ করে বললেন সরি এই রোগী আমি ভর্তি রাখতে পারবো না, আমি ঔষধ লিখে দিচ্ছি আপনারা রোগী নিয়ে চলে যান, আর যদি করোনা টেস্ট করিয়ে নিয়ে আসতে পারেন তাহলে ভর্তি রাখতে পারবো। এই খবর শুনে আমার বন্ধু আকাশ থেকে পড়লো সে ডাক্তার সাহেবকে বললো স্যার আপনি আমার মা’কে এখানে ভর্তি রাখেন যতো টাকা লাগে আমি দিবো তবুও এখান থেকে ফিরিয়ে দিবেন না প্লিজ! কিন্তু ডাক্তার সাহেবের পাষাণ মন গলেনি উনি সাফ জানিয়ে দিলেন, করোনার টেস্ট ব্যাতিত কোনো রোগী রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না।
এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে রিকোয়েস্ট করলাম, তারাও একই কথা বললেন, আগে করোনা টেস্ট করে নিয়ে আসেন, তারপর আমরা রোগী ভর্তি করবো।
এভাবে একবার এদিক একবার সেদিক ঘুরে যখন কোনো কুল-কিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন আমার এক বন্ধুকে ফোন করে বিস্তারিত বলে বললাম যে তুই যেভাবেই হোক আপাতত যেকোনো একটা হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যাবস্থা কর প্লিজ! সে আমাকে বললো ১০ মিনিটের মধ্যে আপডেট দিচ্ছি, কিন্তু আমাদের কাছে এই ১০ মিনিটকে ১০ ঘন্টা মনে হচ্ছিলো, তারপর ঠিক ১০ মিনিট পর ঐ বন্ধুটি আমাকে ফোন করে একটা হাসপাতালের ঠিকানা দিয়ে বললো ওখানে ওমুক ভাই আছে তার সাথে কথা হয়েছে তুরা গেলেই ভর্তি নিয়ে নিবে, সাথে সাথে এম্বুলেন্স কল করে রওয়ানা হলাম ঐ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে লক ডাউন থাকার কারণে  রাজধানীতে তেমন একটা জ্যাম ছিলোনা যার ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা হলো সেই হাসপাতালেও করোনা পরীক্ষা ছাড়া রোগী ভর্তি রাখবে না।
তখন মনে মনে ভাবছি এ কোন দেশে বাস করছি, যেই দেশে এতো এতো হাসপাতাল থাকতে ৭০ বছরের একজন মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি, কিছুই করতে পারছিনা, নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। তবুও সাহস হারায়নি বন্ধুকেও সাহস দিয়ে বললাম চিন্তা করিসনা, একটা না একটা ব্যবস্থা হবে। এই বলে আবার ঐ বন্ধুকে কল দিয়ে বললাম এখানেও তো রাখছে না,
কি করবো? তখন সে তার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে একটা হাসপাতালের এমডির সাথে কথা বলে কনফার্ম করে আমাকে একটা হাসপাতালের এড্রেস এবং মোবাইল নাম্বার দিয়ে বললো উনি হাসপাতালের এমডি তুই উনাকে  ফোন করে আমার রেফারেন্স দিয়ে কথা বল, আমি উনাকে কল দিলাম, উনি কল রিসিভ করার পর বন্ধুর রেফারেন্স দিয়ে একটু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বললাম ভাই আমার গ্রামের এক আত্বীয় খুব-ই অসুস্থ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় নিয়ে আসতেছে এখন আপনার হাসপাতালে ভর্তি করতে চাই।
ও-ই ভদ্রলোক ফোন-ই বিভিন্ন প্রশ্ন করা শুরু করলো, রোগীর জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, গলা ব্যাথা ইত্যাদি আছে কি-না?
আমি বললাম ভাই ওনি হার্টের রোগী আমার জানামতে অন্য কোনো সমস্যা নেই। আপনি অন্তত মানবিক বিবেচনায় একজন মুমূর্ষু রোগীকে ভর্তি করতে হবে। আমি নিজ থেকেই ওনাকে বললাম ভাই আপনি যা ভাবছেন যে, রোগী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কি-না? আসলে এ ধরণের কোনো সম্ভাবনা নেই। আপনি শুধু একটা দিন রোগীটিকে হাসপাতালে রাখার ব্যাবস্থা করেন আমরা করোনার টেস্ট করার পর রেজাল্ট কি আসে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিবো। একথা শোনার পর ওনি রাজি হলেন, সাথে সাথে আবার এম্বুলেন্স নিয়ে রওয়ানা হলাম সেই হাসপাতালের উদ্দেশ্যে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর দ্বায়িত্বরত ডাক্তার বললো সব পরিক্ষা করতে হবে, বন্ধুকে বললাম কি করবো? সে বললো কিছু করার নাই পরীক্ষা যা করার কর তবুও আমার মা’কে বাচাতে হবে। তারপর এদের কে বললাম ঠিক আছে পরীক্ষা করেন, সাথে সাথেই পরিক্ষার কার্যক্রম শুরু করে দিলো। এবার একটু স্বস্তি নিয়ে বন্ধুকে বললাম চল নিচে গিয়ে একটু অপেক্ষা করি, কিন্তু কিছু সময় যেতে না যেতেই ডাক্তার সাহেব রোগীর সাথে কে আছেন তলব করা শুরু করলো।
নার্স এসে বলছে আপনাদেরকে ডাক্তার সাহেব খোঁজ করছে এখনি ৩ তলায় রোগীর কাছে যাওয়ার জন্য বলছে, দুইজনই দৌড়ে গেলাম, যাওয়ার পর ডাক্তার এক্সরের ইমেজ দেখিয়ে বলছে ওনার তো বুকে কফ জমে আছে ঠান্ডা গলা ব্যাথাও আছে আমার মনে হচ্ছে ওনি করোনায় আক্রান্ত তবে আমি কনফার্ম না। আপনারা কালকের মধ্যে করোনার টেস্ট করার ব্যাবস্থা করেন নতুবা আমাদের পক্ষে এই রোগী রাখা সম্ভব হবেনা। আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম,মনে মনে ভাবছি বন্ধুকে কি বলবো। সবকিছু কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। আবার ফোন করলাম হাসপাতালের এমডি সেই বড় ভাইকে তাকে বিস্তারিত বলার পর এখন উনিও তেমন সাই দিচ্ছে না, উনি বলছে ডাক্তার যদি অপারগতা প্রকাশ করে তাহলে আমি প্রেসার দিলে তো হবেনা। আচ্ছা ঠিক আছে সন্ধ্যার পর হাসপাতালে আসবো তখন বুঝিয়ে বলে দেখবো রাজি হয় কি-না? আর নাহলে আমার কিছু করার থাকবে না।
ভাবলাম যেহেতু রোজার মাস সেহেতু ইফতারের পর ছাড়া তো উনি আর আসবেনা। আর আমরাও যেহেতু রোজা তাই ইফতারের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু সময় যেনো আর যাচ্ছে না.. এদিকে আমার বন্ধুর কিন্তু ইফতার নিয়ে টেনশন নেই সে শুধু অপেক্ষায় আছে কখন হাসপাতালের এমডি সাহেব আসবে এবং তার মা’য়ের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত দিবে তাই নিয়ে টেনশনে আছে, উনি এসে যদি বলে রোগী রাখা যাবেনা তাহলে এই রাতের বেলা ৭০ বছর বয়সের বৃদ্ধ মা’কে নিয়ে কোথায় যাবে?
যাক ইফতারের পর হাসপাতালের এমডি সাহেব আসলেন উনি ডাক্তার হওয়ার সুবাদে এসে-ই আমার বন্ধুর মা’য়ের কেবিনে ঢুকলেন উনি সবকিছু দেখে আমাদেরকে ডেকে বললেন রোগীর তো জ্বর ঠান্ডা গলা ব্যাথা আছে তাই আমরা ঢাকা মেডিকেলের একজন ডাক্তারকে আসার জন্য কল করেছি, উনি এসে রোগী দেখার পর কি সিদ্ধান্ত দেয় দেখতে হবে। তারপর আমরা বলতে পারবো রোগী রাখা যাবে কি-না?
কারণ রোগীর যদি করোনা ভাইরাসের লক্ষ্মণ ধরা পড়ে, তাহলে আমার হাসপাতাল সীল গালা করে দিবে।
এই খবর শোনার পর আমার বন্ধু আমার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে, আমি ইশারায় তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, ডাক্তার চলে যাওয়ার পর বন্ধু আমাকে বলে একটা এম্বুলেন্স ব্যাবস্থা করে দে মা’কে নিয়ে বাড়িতে চলে যাবো। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম মাথা ঠান্ডা কর আগে দেখি ঢাকা মেডিকেলের যেই ডাক্তার আসার কথা উনি এসে রোগী দেখার পর কি বলে,তারপর চিন্তাভাবনা করবো।
রাত ৯ টায় ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার হাসিব সাহেব আসলেন, উনি এসে-ই  প্রথম বন্ধুর মা’য়ের কেবিনে গেলেন, উনি দেখে অনেক গুলো পরিক্ষা ও ঔষধ দিলেন এবং বললেন এই মেডিসিন গুলো খাওয়ার পর বলতে পারবো রোগীর কি অবস্থা। এরপর উনি আমাকে আলাদা ভাবে ডেকে নিয়ে বললেন, আমার মনে হচ্ছে
আপনার বন্ধুর মা করোনায় আক্রান্ত  তারপরও যেভাবে-ই হোক আপনারা আগামীকাল সকালে করোনার টেস্ট টা করিয়ে ফেলেন, কারণ করোনা ছাড়াও রোগীর হার্টে এবং নিউরোলজিকাল বড় ধরনের সমস্যা আছে, যেকোনো মুহূর্তে আইসিইউ দরকার হতে পারে, আপনারা বরং যেই হাসপাতালে  আইসিইউ সাপোর্ট আছে সেই হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখেন। ডাক্তার সাহেবের হতাশাজনক  বানী শুনে আমি নিজেও অনেকটা আশাহত হয়ে গেলাম।
এদিকে বন্ধুকে কি বলবো তা-ও মাথায় কাজ করছেনা। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করলাম এবং বন্ধুকে বললাম ডাক্তার সাহেব বললো খালাম্মার যে সমস্যা তাতে হয়তো আইসিইউ সাপোর্ট লাগতে পারে।
এই কথা শুনে আমার বন্ধু বললো আইসিইউ কেনো লাগবে মা’র শরীর কি বেশি খারাপ না-কি? আমি বললাম না তেমন কিছুই না,ডাক্তার সাহেব বলছেন আইসিইউ সাপোর্ট লাগতে পারে, আমরা যেনো মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকি। এরপর আমার বন্ধু দেশের নামকরা ও নামি-দামি এক হাসপাতালে চাকুরীরত তার এক আত্বীয়র সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু তাদেরও একই প্রশ্ন রোগীর করোনা ভাইরাসের টেস্ট করা আছে কি-না? যদি পরীক্ষা করা না থাকে তাহলে রোগী ভর্তি করা যাবে না।
এই খবর শুনে আমি আমার বন্ধুকে বললাম যেহেতু পরীক্ষা ছাড়া কোথাও রোগী ভর্তি নিবেনা সেহেতু সব চিন্তা বাদ দিয়ে সকালে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল অথবা ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে পরিক্ষা করে নিয়ে আসি, আমার বন্ধু বললো ঠিক আছে তাই করি। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা বাসায় চলে আসলাম। পরদিন সকাল ১১ টায় হাসপাতাল থেকে ফোন আসলো এবং বলছে আপনারা রোগী নিয়ে যাননি কেন? আমি বললাম যে আমরা আগে ঢাকা মেডিকেলে যাচ্ছি সেখানে গিয়ে দেখি রোগী ভর্তি করা যায় কি-না? এই বলে দুই বন্ধু রওয়ানা হলাম ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্য রাস্তায় থাকা অবস্থায়-ই ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার হাসিব সাহেব ফোন করে জিজ্ঞেস করলো আপনারা কোথায়?
আমি বললাম ঢাকা মেডিকেলে যাচ্ছি…উনি বললেন তাড়াতাড়ি আসেন আমি ফরম রেডি করে রেখেছি, ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে উনাকে ফোন করলাম উনি বললেন চার তলা আইসিইউর সামনে আসেন, সেখানে যাওয়ার পর উনি একটা ফরম ধরিয়ে দিয়ে বললেন পাশের বিল্ডিংয়ে বার্ন ইউনিটে গিয়ে জমা দিয়ে করোনা পরিক্ষার শিডিউল টা নিয়ে আসেন, বার্ন ইউনিটে যাওয়ার পর শুরু হলো বিভিন্ন ডেস্কে দৌড় ঝাপ একটা প্রশ্ন করলে উত্তর পেতে অনেক সময় লেগে যায় এভাবে ৩ ঘন্টা দৌড় ঝাপ করে কোনো কুল-কিনারা পেলাম না। কারণ এখানে কেউ সঠিক তথ্য জানেনা আর জানলেও হয়তো দেয়না।
তারপর রাজনৈতিক একটা লবিংয়ের মাধ্যমে রোগীকে ভর্তি করতে সক্ষম হলাম। ভর্তির পর নীচ তলা থেকে বললো ভর্তির কাগজ নিয়ে ৩ তলায় চলে যান কিন্তু সেখানে গিয়ে পড়লাম আরেক বিপত্তিতে দ্বায়িত্বরত নার্স বলছে রোগী সাথে নিয়ে আসতে হবে, তা নাহলে সিট দেওয়া যাবেনা অর্থাৎ রোগী ভর্তি রাখা যাবেনা।
আবার ডাক্তার হাসিব সাহেব কে কল করলাম এবার মনে হলো উনি একটু বিরক্তি নিয়েই কলটা রিসিভ করেছেন, উনি বলছে আবার কি হলো? আমি বললাম ভাই ওরা তো রোগী ছাড়া ভর্তি নিচ্ছেনা, ভদ্রলোক বললো নিবেনা তো রোগী নিয়ে আসেন? তখন বন্ধুকে বললাম খালাম্মাকে এখুনি নিয়ে আসতে হবে, তখন বন্ধু বললো এখন তো ইফতারির সময় হয়ে গেছে, কালকে নিয়ে আসলে কেমন হয়? তাছাড়া আম্মার শারীরিক অবস্থাটা তো অনেক খারাপ এত বেশী নাড়াচাড়া করলে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাবে। তারচেয়ে বরং কালকেই নিয়ে আসি, এদিকে ঐ হাসপাতাল থেকে বারবার ফোন করে বলছে আপনারা রোগী কখন নিবেন? তাদেরকে বিস্তারিত বললাম। তখন তারা বলছে ঠিক আছে তহলে কালকে সকালে রোগী নিয়ে যাবেন। আর আপনারা এসে লিখিত দিয়ে যাবেন এই সময়ের মধ্যে রোগীর কোনো কিছু হলে এর দ্বায়-দ্বায়িত্ব আপনারা নিবেন। কি আর করার এই শর্তে-ই রাজি হয়ে রওয়ানা দিলাম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে…….
সেখানে গিয়ে দেখি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবকিছু লিখে রেডি করে রেখেছে, বন্ধুকে বললাম সই দিয়ে চল বাসার দিকে যাই, রাতে বাসায় ফিরে বন্ধুকে বললাম তুই অনেক ক্লান্ত গোসল করে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়।
যেহেতু রমজান মাস সেহরি খাওয়ার জন্য উঠতে হচ্ছে, সেহরি খেয়ে ফযরের নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম ঘুম থেকে উঠে দেখি ১২ টা বেজে গেছে….. তারাতাড়ি রেডি হয়ে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি হাসপাতাল থেকে অনেক গুলো কল এসেছে, সাথে সাথে কল দিলাম ওনারা বলছে আপনারা রোগী কখন নিবেন? আমি বললাম ভাই এম্বুলেন্স আসার জন্য বলছি, আমরাও চলে আসতেছি, এই বলে তাড়াহুড়া করে রওয়ানা দিলাম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়ার পরপরই একাউন্টস থেকে অনেক বড় একটা বিলের কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো স্যার বিলটা দিবেন  প্লিজ! আমার বন্ধু সাথে সাথে পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে বললো, রোগীকে নামানোর ব্যাবস্থা করেন, এরা বলছে লোক বলের সংকট আছে এম্বুল্যান্স এর সাথে যারা আসছে তাদেরকে বলেন রোগীকে নামানুর জন্য এই কথা শোনে আমার বন্ধুর তো মেজাজ পুরাই খারাপ হয়ে গেছে, যাক আমি ওদেরকে ধমক দিয়ে বললাম আপনারা তারাতাড়ি রোগীকে নামানোর ব্যাবস্থা করেন,আমি যতটুকু বুঝতে পারলাম তারা সবাই একটু ভয়ে আছে রোগীর যদি করোনা হয়ে থাকে এজন্য তারা এড়িয়ে যাচ্ছিলো।
এবার এম্বুলেন্স নিয়ে রওয়ানা হলাম ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রাস্তা ফাঁকা থাকায় অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকা মেডিকেলে পৌঁছে গেলাম। ঢাকা মেডিকেলে পৌছানোর পর শুনতে পেলাম যারা টেস্টের সেম্পল সংগ্রহ করবে তারা এখনো আসেনি, আসতে আসতে ৪.৩০ মিনিটে আসবে। এখনো ১.৩০ মিনিট বাকি সময় যেনো যাচ্ছেনা, অবশেষে ওনারা ৫টায় আসলেন, দৌড়ে গিয়ে ওনাদেরকে বললাম যে আমার রোগী বয়স্ক এবং অনেক অসুস্থ একটু তাড়াতাড়ি করেন, উনারা একটু বিরক্তি নিয়ে-ই বললেন আপনি বললেই তো তাড়াতাড়ি করা যাবেনা, আমি রাগ না করে একটু অসহায় ভাব নিয়ে বললাম ভাই রাগ কইরেন না প্লিজ একটু ভাবুন আমার জায়গায় আপনি থাকলে কি করতেন? তখন তাদের মনে একটু দয়া হলো বললো কি সমস্যা বলেন? আমি বললাম গতকাল করোনা টেস্টের ফরম জমা দিয়ে গিয়েছিলাম আজকে ৪টায় রোগী নিয়ে আসতে বলেছিলেন তাই রোগী নিয়ে আসলাম উনি রোগীর নাম এবং বয়স জিজ্ঞেস করলেন আমি সব বললাম তখন উনারা আমাকে বললো আপনার রোগী নিয়ে আগামীকাল সকালে আসতে হবে, আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম, চিন্তা করছি বন্ধূকে বা কি বলবো, বুঝে উঠতে পাড়ছিলাম না। হতাশ হয়ে এম্বুলেন্স এর সামনে গিয়ে দেখি আমার বন্ধু মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে দেখে বললো ওরা কি বলছে? আমি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বললাম ওরা তো বললো আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।
আমার বন্ধু হয়তো বুঝতে পারছে যে আমি তার সাথে কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করছি, বন্ধুটি আমাকে বলছে, কোনো সমস্যা হলে বল মা’কে নিয়ে বাড়িতে চলে যাই, যা হবার হবে। আমি কোনো কিছু না বলে মোবাইলে আমার এক আত্মীয়র নাম্বার খুজচ্ছিলাম, কারণ উনার আবার ঢাকা মেডিকেলে বেশ প্রভাব আছে, যাক নাম্বারটা পেয়ে গেলাম, তারপর বন্ধুর কাছ থেকে একটু আড়ালে গিয়ে ওনাকে ফোন করলাম উনিও খুব ব্যাস্ত মানুষ তাই ফোন রিসিভ করতে একটু দেরি হচ্ছিলো কিন্তু আমার তো সহ্য  হচ্ছেনা, কিছুক্ষণ পর উনি কল ব্যাক করে জিজ্ঞেস করলো কি ব্যাপার এতো কল কেনো? জরুরী কিছু? আমি ওনাকে সব খুলে বললাম এরপর উনি আমাকে বললো ওদেরকে আমার রেফারেন্স দিয়ে রিকুয়েষ্ট করো, সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে ওনাদের একজনের কানে মুখে আত্নীয়র পরিচয় দিয়ে বললাম উনি আমাকে পাঠিয়েছে, তখন ওরা বললো ঠিক আছে থাকেন, দেখছি কি করা যায়। তারপর কিছুটা আস্বস্ত হয়ে বন্ধুকে বললাম এম্বুলেন্স থেকে খালাম্মা কে নামিয়ে ১০১ নাম্বার রুমের সামনে নিয়ে আস, ১০১ নাম্বার রুমের সামনে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর ডাক আসলো রাজিয়া বেগম বয়স ৭০ আছেন? ডাক শুনার সাথে সাথে আমার বন্ধু চোখে মুখে আনন্দ নিয়ে বলছে হ্যাঁ আছে, আমিও একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কিছুক্ষণের মধ্যে-ই ওনারা এসে সেম্পল সংগ্রহ করে নিয়ে গেলো বললো ২দিন পর এসে রিপোর্ট নিয়ে যাবেন। ঢাকা মেডিকেলের এই অবহেলা অসহযোগিতা ও অসদাচরণ দেখে এবার আমার বন্ধু আমাকে বলছে, বন্ধু আম্মাকে এখানে রাখলে আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাবে, তারচেয়ে বরং বাড়িতে নিয়ে যাই,২দিন পর পরিক্ষার রেজাল্ট দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবো। আমিও আর বাধা না দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে-ই বিদায় দিলাম।
এবার আমার প্রশ্ন হলো মানুষের সেবায় -ই যদি দিতে না পারে তাহলে আমাদের দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো এতো এতো  হাসপাতাল গড়ে উঠেছে কেন?
শুধু কি গ্রামের নিরীহ গরীব অসহায় মানুষদের রক্ত চুষে খাওয়ার জন্য? আমাদের দেশের মতো পৃথিবীর কোনো দেশে এতো হাসপাতাল ও এতো ফার্মেসী নেই। কিন্তু তবুও তারা স্বাস্থ্য সেবায় আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে, কারণ তাদের দেশের হাসপাতালের মালিক ও ডাক্তাররা
এই পেশাটাকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও পেশা হিসেবে মনে করে, যা আমাদের দেশের খুব কম সংখ্যক মালিক এবং ডাক্তারদের মাঝে দেখা যায়। আমাদের দেশের ডাক্তারদের মধ্যে বেশিরভাগ ডাক্তার-ই কমার্শিয়াল।
সরকারের প্রতি অনুরোধ রইলো দয়া করে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও উন্নত করার ক্ষেত্রে একটু গুরুত্ব দিন।
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের প্রধান কয়েকটি স্তম্ভ হচ্ছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থান এই সেবা গুলো যতদিন পর্যন্ত জনগণ ভোগ করতে না পারবে ততদিন একটি রাষ্ট্র উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে গন্য হতে পারে না।
বিঃদ্রঃ- আলহামদুলিল্লাহ অবশেষে আমার বন্ধুর মা’য়ের করোনা টেস্টের রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে।
লেখক- মোঃ জহির উদ্দিন বাবর
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট