আব্বুর কাছে শেষ চিঠি

প্রকাশিত: ৭:৫০ অপরাহ্ণ , ২ জানুয়ারি ২০২০, বৃহস্পতিবার , পোষ্ট করা হয়েছে 4 years আগে
লেখক : সালমা আক্তার ইভা। অনার্স ১ম বর্ষ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর কলেজ।

প্রিয় আব্বু,
জানো, আব্বু আজও আম্মু আমায় বকেছে। তুমি বারণ করেছিলে না? কিন্তু, আম্মু শুনেনি। আমাকে বকেছে অনেক। কিন্তু, আমি আজ কান্না করিনি। কারন, আমি তোমার কথা শুনেছি। তুমি বলেছিলে,”আম্মু বকা দিলে কান্না করতে নেই”। আম্মু তোমার কথা না শুনলেও আমি শুনেছি। আব্বু, আম্মু আমার সব খেলনা গুছিয়ে রেখে দিয়েছে। এখন বিকেলে জনি আসলে আমি কিভাবে খেলবো বলো?

জনি তো ভাববে আমার বুঝি খেলনা নেই। স্কুলে গিয়ে সবাইকে বলবে। সবাই আমাকে নিয়ে হাসবে।

আব্বু, আমি অনেকদিন ধরে আইসক্রিম খাইনা। আম্মু বলে ঠান্ডা লাগবে। আম্মুকে বলেছি সাইকেল কিনে দাও। কিন্তু দেই না। বলে যে, ব্যথা পাবো।

সাকিব, ফাহিম সবাই খেলতে যায়, আম্মু আমাকে দেয় না। বলে যে দরকার নেই। যেতে হবে না।

আব্বু, রাশিদ আমার সাথে আবারো ঝগড়া করেছে। আম্মুকে বলেছি কিন্তু আম্মু টিচার এর কাছে বিচার দেয় নি। তাই আমি আম্মুর প্রতি ভীষণ রাগ।

আম্মু আমাকে পিজ্জা এনে দেয় না। কেনো জানি কোনো কথায় শুনে না। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় কিন্তু আম্মু যখন কান্না করে তখন রাগ সব চলে যায়।

জানো আব্বু, আম্মু অনেক কান্না করে। কেন করে আমি জানি না। তুমি কি আম্মুকে বকেছো?
আমি যে তোমার কাছে বিচার দেই সে জন্য কি তুমিও আম্মুকে অনেক বকেছো?বুঝেছি, তাই তো আম্মু আমার প্রতি রাগ আমাকে পিকনিক এ যেতে দিবে না বলেছে। আমি যে তোমার কাছে বিচার দেয় তাই বকা দিয়েছো। বেশ করেছো।
আব্বু জানো, আম্মু আমাকে সারাদিন ঘরে বসে থাকতে বলে।

তুমি যেদিন চলে গেছো অনেক মেহমান এসেছিলো। আমি স্কুল থেকে এসে তো বাসায় বসার জায়গায় পাচ্ছিলাম না। তোমার প্রতি আমার ভীষণ রাগ।

কেন? না বলে চলে গেলে কেন?
আচ্ছা, আব্বু মাহি বলছিলো তুমি নাকি মাটির নিচে থাকো? কিন্তু কিভাবে? আম্মুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আম্মু বলেছে কারোর সাথে কথা না বলতে চুপচাপ ঘরে বসে থাকতে।

তোমার কথা জিজ্ঞেস করলে বকা দেয় কিন্তু কিছুক্ষণ পর এসে জড়িয়ে ধরে কান্না করে।
আচ্ছা, আব্বু তুমি কবে আসবে আমার আর ভালো লাগে না একা বাসায় থাকতে।

আম্মুও আমার সাথে খেলে না আমাকে বের হতে দেয় না।আমিও একা বসে থাকি। ভিডিও গেমস খেলতেও দেয় না। তোমাকে অনেক মিস করি আব্বু। তাড়াতাড়ি চলে আসবা বাসায়। এসে আম্মুকে অনেক বকা দিবা আর আমাকে অনেক ভালোবাসবা। লাভ ইউ আব্বু।

তোমার জিয়ান 

চিঠিটা লিখেই হাতে নিলো জিয়ান। বাহিরের দরজাটা খোলা। সে তার রুম থেকে বের হয়ে আড় চোখে একবার তার আম্মুর রুমে তাকালো দেখলো আম্মু নেয়। চোখটা বন্ধ করেই বাহিরের দরজাটার দিকে দৌড় দিতে তার হাত ধরে ফেলে জিসা।

:- তোমাকে না বলেছি ঘরে থাকো। কোথায় যাচ্ছো?
– আম্মু আমি কোথাও যাচ্ছি না।
:- হাতে কি? দেখি দেখাও তো।
( জিয়ান এর অনিচ্ছায় চিঠিটা হাত থেকে নিলো তার মা। পুরো চিঠি পরে জিসার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।)
এসব কি লিখেছো? আর কোথায় যাচ্ছো এইটা নিয়ে?
– আম্মু, আমি আব্বুর কাছে যাচ্ছি। মাহি বলেছে আব্বু নাকি মাঠের পিছনে যে একটা জায়গা আছে ওইখানে মাটির নিচে আছে। আব্বু নাকি আমার কথা শুনতে পাবে না। তাই চিঠি লিখে দিয়ে আসবো। যেন, তোমাকে অনেক বকে আর তাড়াতাড়ি চলে আসে বাসায়।

জিসার তার সন্তানকে বুকে নিয়ে চিৎকার করে কান্না করতে থাকে।
(জিয়ানের আব্বু গত একমাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়)
এ কান্না থামাবে কে?
কে জিয়ানকে বুঝাবে তার বাবা আর কখনো তার কাছে ফিরে আসবে না?
কে বুঝাবে তাকে তার আম্মুর কান্না করার মানে?
এভাবেই চিৎকারে হাজারো কষ্ট আটকে আছে ।
না হলো জিয়ানের তার আব্বুকে বিচার দেওয়া আর না হবে বাবার সাথে খেলা।
শেষ চিঠিটা আব্বুকে দেওয়া হলো না………….

লেখকের পরিচিতি :
সালমা আক্তার ইভা
অনার্স ১ম বর্ষ,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর কলেজ।

মন্তব্য লিখুন

আরও খবর